:

ইরান যুদ্ধ বিশ্বে প্রবৃদ্ধি কমছে- আইএমএফ

top-news

বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার বার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কম।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংশোধনের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাত।

আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গুরিনচাস জানিয়েছেন, বর্তমান ৩ দশমিক ১ শতাংশ পূর্বাভাসটি ধরে নেওয়া হয়েছে যে, ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি বাজার আবার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ‘অ্যাডভার্স সিনারিও’র দিকে চলে যেতে পারে।

তার ভাষায়, বিশ্ব অর্থনীতি এখন ‘দুই অবস্থার মাঝখানে’ রয়েছে, একদিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল পূর্বাভাস, অন্যদিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নিম্ন প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রতিদিনই যদি জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে, তাহলে আমরা ধীরে ধীরে নেতিবাচক পরিস্থিতির আরও কাছাকাছি চলে যাচ্ছি।’

এই সতর্কবার্তার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো জ্বালানি বাজার। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে, যা সরাসরি বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো, যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সীমিত এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেশি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আইএমএফ তাদের ২০২৬ সালের উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ করেছে, যা আগের ৪ দশমিক ২ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য হ্রাস।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই সংকট শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গাণিতিক হিসাব নয়, বরং এটি একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি করছে। একদিকে সরকারগুলোকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। একইসঙ্গে সামাজিক ব্যয় বাড়ানো এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ, এই দুই চাপের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আইএমএফের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য এক ধরনের ‘ইমিডিয়েট ট্রেড-অফ বা তাৎক্ষণিক আপস’ তৈরি করেছে। অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, এই তিনটি লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতাও বাড়াতে পারে। জ্বালানি দামের ওঠানামা, খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রার অস্থিরতা অনেক দেশে সামাজিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

আইএমএফের এই সতর্কবার্তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। ইরানকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি শুধু কমবে না বরং নতুন এক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার যুগে প্রবেশ করার ঝুঁকি তৈরি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *