যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে লাখ লাখ মানুষ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 29 Mar, 2026
আগ্রাসী অভিবাসনবিরোধী নীতি এবং ইরানে যুদ্ধসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরও কয়েকটি নীতির প্রতিবাদে গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নগরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে।
ট্রাম্পবিরোধী এ বিক্ষোভ ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে শনিবার তৃতীয়বারের মতো ‘নো কিংস’ বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
এদিন যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০টির বেশি জায়গায় বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আগের দুটো বিক্ষোভে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। তবে এবার সবচেয়ে বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় মিছিল হয়েছে নিউইয়র্ক, টেক্সাসের ডালাস, পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া ও ওয়াশিংটনে, যদিও দুই-তৃতীয়াংশ মিছিলের আয়োজন হয়েছে বড় বড় শহরের বাইরে।
আয়োজকেরা বলেছেন, গত বছরের জুনে প্রথমবার ‘নো কিংস’ বিক্ষোভের তুলনায় ছোট ছোট শহরগুলোতে বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেন্ট পলের বাইরে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্পের আগ্রাসী অবৈধ অভিবাসননীতির কারণে এ অঙ্গরাজ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সেখানে বিক্ষোভ মিছিলে অনেকেই নানা ধরনের পোস্টার উঁচিয়ে ধরেছিলেন। কারও কারও পোস্টারে রেনি গুড ও অ্যালেক্স প্রেটির ছবি দেখা গেছে। এ বছর মিনিয়াপলিসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা এই দুজনকে গুলি করে হত্যা করেন।
জনসভায় মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালৎস বলেন, ট্রাম্প ও তাঁর নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা যে প্রতিবাদ করছেন, সেটাই প্রমাণ করে—তাঁরাই যুক্তরাষ্ট্রের ভালো দিকগুলোর আসল শক্তি।
ওয়ালৎস আরও বলেন, ‘তাঁরা আমাদের কট্টরপন্থী বলেন। আপনারা একদম ঠিক বলেন, আমরা কট্টরপন্থী, আমরা সত্যই প্রভাবিত হয়েছি—মানবিকতা দ্বারা প্রভাবিত, শালীনতা দ্বারা প্রভাবিত, ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত, গণতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে যা কিছু করা সম্ভব, তা করতে আমরা প্রভাবিত হয়েছি।’
ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সও মিনেসোটায় বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই দেশকে স্বৈরাচার বা অলিগার্কদের দিকে পতিত হতে দেব না। এ দেশে জনগণের শাসন থাকবে।’
নিউইয়র্কে ম্যানহাটানে এদিন প্রায় লাখো মানুষ বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এখানে বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজকদের একজন ছিলেন বিখ্যাত হলিউড অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো।
রবার্ট ডি নিরো বলেন, ‘ট্রাম্পের আগে আর কোনো প্রেসিডেন্ট আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে এতটা অস্তিত্বের সংকটে ফেলেননি।’
৫৪ বছর বয়সী হলি বেমিস বলেন, তিনি এবং নিউইয়র্কে প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণকারী অন্যরা সেই একই চেতনায় কাজ করছেন, যেভাবে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা আমেরিকান বিপ্লবে লড়াই করেছিলেন।
এই নারী বলেন, ‘আমরা রাজাদের শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছি এবং আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়েছি। এখন আমরা আবারও ঠিক সেই কাজই করছি।’
ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে প্রতিবাদে জড়ো হওয়া লোকজন গণতন্ত্রের সমর্থনে স্লোগান দেন। এ সময় তাঁরা ট্রাম্পবিরোধী প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন।
মেরিল্যান্ডে একদল বয়স্ক মানুষ হুইলচেয়ারে বসে হাতে প্ল্যাকার্ড ধরে প্রতিবাদ জানান। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’, ‘গণতন্ত্র চাইলে আওয়াজ তুলুন’ এবং ‘ট্রাম্পকে বিদায় দিন’।
ডালাসে অনুষ্ঠিত সমাবেশে কয়েক হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে ‘নো কিংস’ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাঁদের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে প্রতিবাদে অংশ নেন অবসর জীবনে যাওয়া টেরেসা গানের। তিনি বলেন, তিনি এতে অংশ নিয়েছেন কারণ—সবারই স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ও লোভের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
টেরেসা বলেন, ‘ট্রাম্প যা কিছু করছেন, তার সবই নিজেকে আরও ধনী করতে এবং সাধারণ মার্কিনদের কাছ থেকে সম্পদ কেড়ে নিতে।’
গতকাল শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার ‘দাঙ্গাকারী’ একটি ফেডারেল ভবন ঘিরে রাখার সময় দুজনকে ফেডারেল আইন প্রয়োগকারীদের ওপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
লস অ্যাঞ্জেলেস পুলিশ বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে, ফেডারেল কারাগারের আশপাশের এলাকা থেকে সরে না যাওয়ার কারণে একাধিক বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সেখানে বিক্ষোভকারীরা একটি বেড়ার ওপার থেকে ইট-পাটকেল ছুড়লে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী এক নজিরবিহীন বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের নীতি ও তাঁর প্রশাসনের স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদে আজ শনিবার লাখো মার্কিন নাগরিক রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। নো কিংস বা ‘আমাদের কোনো রাজা নেই’ স্লোগান সামনে রেখে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের ৩ হাজার ২০০-এর বেশি শহরে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শহরে এরই মধ্যে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হতে শুরু করেছেন। আয়োজকদের দাবি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক দিনে সবচেয়ে বড় অহিংস প্রতিবাদের ঘটনা।
গত বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ করে বিচার বিভাগের ওপর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণ ও কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোতে আমূল পরিবর্তনের প্রতিবাদে ‘নো কিংস’ আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, ট্রাম্প নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে বা রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন, যা মার্কিন সংবিধানের পরিপন্থী।
এর আগে নো কিংস স্লোগান নিয়ে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে দুটি বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। স্লোগানটাই এখন আন্দোলন বা বিক্ষোভের নামে পরিণত হয়েছে। গত বছরের দুটি বিক্ষোভে লাখ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন।
কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নো কিংস আন্দোলন পরিচালনা করে না। ‘ইন্ডিভিজিবল’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম এ আন্দোলনের মূল উদ্যোক্তা হলেও বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন, নাগরিক অধিকার প্ল্যাটফর্ম এবং যুদ্ধবিরোধী কিছু গোষ্ঠী সম্মিলিত এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে এবারের নো কিংস বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। হামলার এক মাস পূর্তির এই দিনটি গতকালের বিক্ষোভের জন্য বেছে নিয়েছেন আয়োজকেরা। তাঁদের মতে, এই অবৈধ ও বিপর্যয়কর যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে চরম বিপদে ফেলছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইন্ডিভিজিবলের সহপ্রতিষ্ঠাতা লিয়া গ্রিনবার্গ বলেন, ছোট ছোট শহরে এবার বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এটাই এবারের বিক্ষোভের বিশেষত্ব। এবার আইডাহো, ওয়াইমিং ও ইউটাহর মতো রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোর একাধিক শহরে বিক্ষোভ হচ্ছে।
এসব বিক্ষোভকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত গুরুত্ব দিতে নারাজ। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যাবিগেইল জ্যাকসন এসব বিক্ষোভকে তুচ্ছ করে ‘ট্রাম্পবিরোধীদের মানসিক উন্মাদনা নিরাময়ের চিকিৎসা’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ) মনে করে, এই গণজোয়ারের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন নতিস্বীকার করতে বাধ্য হবে।
চলতি বছরের শেষে নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে নো কিংস আন্দোলনের এই বিশাল বিক্ষোভ ট্রাম্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
শিল্পীদের ‘নীরবতা ভাঙার’ আহ্বান
ওয়াশিংটনের বিখ্যাত জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসের সামনে শুক্রবার বিখ্যাত মার্কিন শিল্পী, সাংবাদিক ও লেখকদের অনেকে জড়ো হয়েছিলেন। অস্কারজয়ী প্রবীণ অভিনেত্রী ও অধিকারকর্মী জেন ফন্ডারের নেতৃত্বে এই সমাবেশ থেকে ট্রাম্পের ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসনের কড়া সমালোচনা করা হয়। ৮৮ বছর বয়সী ফন্ডা সতর্ক করে বলেন, ‘যখন ভয় জেঁকে বসে, তখন নীরবতা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের এখনই এই স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইতিহাস মুছে ফেলতে বই নিষিদ্ধ করছে এবং শিল্পকলা ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। শিল্পীদের কণ্ঠ স্তব্ধ করা এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন মুছে ফেলা স্বৈরতন্ত্রের প্রাথমিক ধাপ।
প্রবীণ সাংবাদিক জয় রিড ও জিম অ্যাকোস্টা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার একটি আদর্শবাদী শাসনব্যবস্থা বা রেজিমের মতো আচরণ করছে, যেখানে ভিন্নমতের কোনো স্থান নেই।
দ্য গার্ডিয়ান জানায়, বর্ষীয়ান সংগীতশিল্পী জোয়ান বায়েজ ও ম্যাগি রজার্স গান গেয়ে কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানান। জেন ফন্ডা ও জোয়ান বায়েজ গতকাল মিনেসোটার নো কিংস বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন।
ইরানে সরকারপন্থীদের সংহতি মিছিল
দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানজুড়ে সরকারের পক্ষে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের প্রতিবাদে ৮৫০-এর বেশি বিক্ষোভ হয়েছে।
তবে পশ্চিমারা অভিযোগ তুলেছে, এই সংহতির আড়ালে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর কঠোর দমন চলছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২৭ দিনে প্রায় ১ হাজার ৪৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
২৫ মার্চ তেহরানে একটি সরকারবিরোধী মিছিলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যুদ্ধে ইরানে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৯০০-এর বেশি মানুষ নিহত ও অন্তত ২০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

