:

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি: মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে শান্তির নতুন সূর্য, নাকি ঝড়ের আগের স্তব্ধতা?

top-news

দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম উত্তেজনা এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বহুল প্রতীক্ষিত ও চাঞ্চল্যকর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে 'ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক' (Islamabad Memorandum) নামে পরিচিত এই চুক্তি বিশ্ব রাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

কাতার, পাকিস্তান ও সুইজারল্যান্ডের মতো মধ্যস্থতাকারীদের কয়েক মাসের রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর গত ১৪ জুন এই ঐতিহাসিক ঘোষণা আসে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম সিএনএন এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তিতে মূলত ১৪টি দফা রয়েছে, যার মধ্যে প্রধান ৫টি বিষয় বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে:

৬০ দিনের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি: গত এপ্রিল মাসে হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়িয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আরও ৬০ দিন করা হয়েছে। এই সময়ে কোনো পক্ষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সামরিক উস্কানি দিতে পারবে না।

হরমুজ প্রণালি উন্মুক্তকরণ: বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও নিরাপদ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে।

নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল: বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের কঠোর নৌ অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর থাকা কড়াকড়ি সাময়িকভাবে শিথিল করবে।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল: এই চুক্তির আওতায় ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ হয়ে থাকা ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করে ইরানের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক তহবিল গঠনের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে ওয়াশিংটন।

পারমাণবিক কর্মসূচিতে ‘স্থিতাবস্থা’: আগামী ৬০ দিন ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বর্তমান স্তরেই আটকে রাখবে (Status Quo) এবং কোনো নতুন পারমাণবিক পরীক্ষা চালাবে না।

 বিশ্ব গণমাধ্যমের চোখে এই চুক্তি: জয় কার হলো?
এই চুক্তিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে বিশ্লেষণ করছে:  পশ্চিমা গণমাধ্যম (যেমন- বিবিসি, রয়টার্স): তাদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণ করা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ কমানো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বিজয়। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইরান শর্ত ভঙ্গ করলে ৬০ দিন পর তারা আবারও সামরিক অ্যাকশনে যাবে।

ইরানি ও আঞ্চলিক গণমাধ্যম (যেমন- প্রেস টিভি, আল জাজিরা):  ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম একে "তেহরানের কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিজয়" হিসেবে উদযাপন করছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের ফলে পঙ্গু হয়ে পড়া ইরানি অর্থনীতির জন্য এই চুক্তি একটি বড় সঞ্জীবনী সুধা।

এই ঐতিহাসিক চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টিকবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ক) অর্থনৈতিক স্বস্তি ও জ্বালানি বাজার: এই চুক্তি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় নিশ্বাস ফেলার জায়গা। হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে গেলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক ধাক্কায় ব্যারেল প্রতি ১৫ থেকে ২০ ডলার পর্যন্ত কমে আসতে পারে, যা বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে বলে মন্তব্য করেছন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদ ড. ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডনার ।

খ) ইরানের কৌশলগত চাল:  ইরান এই চুক্তিকে ব্যবহার করছে মূলত নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার জন্য। ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অবমুক্ত তহবিল এবং তেল বিক্রির টাকা তারা তাদের অর্থনীতি সচলের পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক (হিজবুল্লাহ, হুথি) ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আরও শক্তিশালী করতে ব্যবহার করতে পারে বলে মন্তব্য করেছন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ।

গ) স্থায়িত্বের সংকট:  এটিকে কোনোভাবেই ‘স্থায়ী শান্তি চুক্তি’ বলা যায় না। এটি মূলত একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাঝে পাওয়া সাময়িক বিরতি মাত্র। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার মূল অবিশ্বাসের জায়গাগুলো এখনো অমীমাংসিত বলে মন্তব্য করেছন মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক ফরাসি বিশ্লেষক
প্রফেসর ভ্যালিরি ফাজাল ।

সবচেয়ে বড় কাঁটা: ইসরায়েল ও লেবানন ফ্যাক্টর
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এবং ঝুঁকির জায়গা হলো লেবানন-ইসরায়েল সীমান্ত। ইরান এই চুক্তিকে "সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি" হিসেবে দাবি করলেও, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইসরায়েল মনে করে, এই চুক্তির আড়ালে ইরান ও হিজবুল্লাহ নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করার সুযোগ পাবে, যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি।

আপাতত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশ এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির মাইন অপসারণ ও নৌ সুরক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে আগামী ৬০ দিন মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকদের টেবিল বৈঠক এবং ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে—এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, নাকি আরও বড় কোনো মহাযুদ্ধের আগের শান্ত পরিবেশ মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *