:

সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু

top-news

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজের ভেতর ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত গ্যাসে দমবন্ধ হয়ে অন্তত ৯ শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

এ ঘটনায় অসুস্থ ও গুরুতর আহত হয়ে আরও ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় অবস্থিত ‘ফেরদৌস স্টিল’ নামের শিপইয়ার্ডে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী একটি পুরোনো জাহাজ কাটার সময় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, উদ্ধার তৎপরতা জোরদার এবং বিপজ্জনক গ্যাস লিকেজ নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক জানিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারির পাশাপাশি নিহত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী, ফায়ার সার্ভিস ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ইয়ার্ডসংলগ্ন সাগরে নোঙর করা এলএনজি জাহাজটির কাটিংয়ের কাজ প্রায় শেষপর্যায়ে ছিল। নিয়ম অনুযায়ী পুরোনো জাহাজ কাটার আগে পাইপ ও ট্যাংকে জমে থাকা বিষাক্ত বর্জ্য বা গ্যাস সম্পূর্ণ অপসারণ (গ্যাস ফ্রি) করার কথা থাকলেও তা না করেই শ্রমিকদের ভেতরে নামানো হয়।

কাজ চলাকালে হঠাৎ তীব্র মাত্রার কার্বন মনোক্সাইড বা ক্লোরিন জাতীয় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে অক্সিজেনের অভাবে ঘটনাস্থলেই কয়েকজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন এবং তিনজনের মৃত্যু হয়।

পরে চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও পাঁচজনকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা এবং বিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালে আরেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। গ্যাসের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কারখানার পাশের খালে নৌকা নিয়ে প্রবেশ করতে পারেননি স্থানীয় জেলেরাও।

দুর্ঘটনার পেছনে মালিকপক্ষের চরম গাফিলতির সুস্পষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)।

চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি, ৪ মে ও ৮ জুন—তিন দফা নোটিশ ও তাগিদপত্র দেওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ অগ্নি ও পেশাগত নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী বা পর্যাপ্ত অক্সিজেন ব্যবস্থা ছাড়াই বিপজ্জনক ট্যাংকে শ্রমিকদের প্রবেশ করানো হয়েছিল।

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ডিআইএফই প্রতিনিধি দল পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় উত্তেজিত জনতার ক্ষোভের মুখে পড়ে মারধরের শিকার হন দুই শ্রম পরিদর্শক। এদিকে ওই ইয়ার্ডে সংশ্লিষ্ট জাহাজটি ভাঙার পরিবেশ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের যথাযথ অনুমতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *