মেট্রোরেল থেকে সাভার: নব্য জেএমবির নীল নকশা : রাজধানীর উপকণ্ঠে ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 12 Aug, 2026
গাড়ির চালক পরিচয়ে সাভারের শ্যামপুরে মাসে চার হাজার টাকায় বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। সাথে ছিল একটি মাত্র ফ্যান লাগানোর অজুহাত আর রাতে চুপিচুপি রহস্যময় ভারী জিনিসপত্র ঘরে ঢোকানোর তাড়াহুড়ো। কিন্তু সেই সাধারণ ভাড়াটিয়ার ছদ্মবেশের আড়ালে যে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর জঙ্গি আস্তানা—তা টের পাননি বাড়ির পক্ষাঘাতগ্রস্ত মালিক বা প্রতিবেশীরাও।
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি), জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ও স্থানীয় পুলিশের যৌথ এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে উন্মোচিত হয়েছে সাভারের হেমায়েতপুরের এই গোপন বোমার কারখানা, যা কাঁপিয়ে দিয়েছে পুরো এলাকাকে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা পৌনে আট ঘণ্টার এক অভিযানে দক্ষিণ শ্যামপুরের ওই আস্তানা ও তার আশপাশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে নব্য জেএমবির সক্রিয় সদস্য মোহাম্মদ আরিফকে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ১৫টি শক্তিশালী পাইপ বোমা, গান পাউডার, বিষাক্ত সায়ানাইড, জেএমবির দাওয়াতি লিফলেট এবং অতিদাহ্য বিস্ফোরক উপাদান ‘টিএটিপি’ (ট্রাই এসিটোন ট্রাই পারঅক্সাইড)।
এর আগে হেমায়েতপুর থেকে একটি ব্যাগে লুকানো ৬টি পাইপ বোমাসহ আরিফ ধরা পড়ার পরই তার দেয়া স্বীকারোক্তিতে এই আস্তানার খোঁজ মেলে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, সাভারের এই বোমা কারখানাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি ঢাকা ও তার আশপাশে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক বোমাতঙ্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, সাভারে উদ্ধার হওয়া এসব পাইপ বোমার সাথে কিছুদিন আগে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনে উদ্ধার হওয়া পাইপ বোমার হুবহু মিল রয়েছে।
শুধু তাই নয়, সম্প্রতি আশুলিয়ার মুদিদোকানের সামনে এবং সাভারের সাধাপুর ঘোড়া মসজিদের মাঠে ড্রামের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া প্রেশার কুকার বোমাগুলোর তৈরির পেছনেও জড়িয়ে আছে হেমায়েতপুরের এই আস্তানার নাম।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত ডিসেম্বরে কেরানীগঞ্জের মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ, যাত্রাবাড়ীতে পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে বোমার ব্যাগ ফেলে পালানো, কুমিল্লার শিব মন্দিরে বিস্ফোরণ এবং সায়দাবাদে পুলিশি তল্লাশিতে বোমা হামলার মতো একাধিক নাশকতার নেপথ্যে এই আরিফের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, জঙ্গি সংগঠনটির দক্ষ কারিগর ‘বোমারু মামুন’ নিয়মিত এই আস্তানায় এসে বোমা তৈরিতে দিকনির্দেশনা দিতেন।
পাশাপাশি এক হোমিও চিকিৎসকের নামও উঠে এসেছে, যাকে আরিফের গুরু হিসেবে সন্দেহ করা হচ্ছে। সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সহায়তায় উদ্ধার হওয়া সমস্ত প্রাণঘাতী বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করা হলেও, এই ভয়ংকর নেটওয়ার্কের শিকড় কতদূর ছড়িয়ে আছে তা উন্মোচনে আরিফকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ চালানো হচ্ছে।
সাধারণ চালকের ছদ্মবেশে রাজধানীর উপকণ্ঠে নব্য জেএমবির এই শক্তিশালী ঘাঁটি গাড়ার চেষ্টা এবং একের পর এক বোমা হামলার নীল নকশা উন্মোচনের মধ্য দিয়ে একটি বড় ধরনের নাশকতা এড়ানো গেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

