:

টানা ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের স্থবির বন্দরনগরী

top-news

টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল এবং সাগরের জোয়ারের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ত্রিমুখী সংকটে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ আশেপাশের উপজেলাগুলোতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে নগরের জনজীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অফিস চট্টগ্রাম বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করেছে এবং পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে।

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় ৩৩০.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা—এই ৩ ঘণ্টায়ই বৃষ্টি হয়েছে ৬০ মিলিমিটার। অন্যদিকে, নগরের আমবাগান আবহাওয়া কেন্দ্র ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।

ভারী বৃষ্টির সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর জোয়ার ও পাহাড়ি ঢল যুক্ত হওয়ায় নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, মোহরা, পতেঙ্গা আকমল আলী সড়ক ও বড় দিঘির পাড়সহ বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে।

রাস্তায় গণপরিবহন না থাকায় অফিসগামী যাত্রী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। রিকশাচালকেরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। 

প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অর্ধবার্ষিক ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অনেককে কোমরসমান পানি পেরিয়েই পরীক্ষা কেন্দ্রে যেতে দেখা গেছে।

ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়কের বড়দিঘি পাড় এলাকা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় উভয় লেনে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। সিএনজিচালিত অটোরিকশা পানিতে বিকল হয়ে পড়ে। জলাবদ্ধতার কারণে চিকনদণ্ডী ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও পানি প্রবেশ করেছে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও কম্পিউটার রক্ষা করতে তা আলমারির ওপরে তুলে রাখা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওবায়দুল আকবর জানান, প্রতি বর্ষায় এই পরিস্থিতি হলেও তারা সেবা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

এদিকে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকায় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০-৯০ কিলোমিটার হওয়ায় এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৩টি ফ্লাইট অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ডাইভার্ট করা হয়েছে। বিমানবন্দরের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল জানান, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের আবুধাবি-চট্টগ্রাম (BS350) ও এয়ার আরাবিয়ার শারজাহ-চট্টগ্রাম (G9-526) ফ্লাইট ডাইভার্ট হয়ে ঢাকায় নেমেছে। এছাড়া বিমান বাংলাদেশের ঢাকা-চট্টগ্রাম (BG121) ফ্লাইটটি অবতরণ করতে না পেরে পুনরায় ঢাকায় ফিরে গেছে। আজ বিমানবন্দরের প্রায় সব ফ্লাইটের শিডিউলে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হচ্ছে।

পাহাড় ধ্বসের আশংকায় চট্টগ্রাম মহানগরীর এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে জেলা প্রশাসন নির্দেশনা জারি করেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্নস্থানে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

টানা ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ, পুঁটিবিলা ও আধুনগরসহ কয়েকটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে এবং মাইকিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জরুরি তথ্যের জন্য প্রশাসন কয়েকটি হেল্পলাইন নম্বরও (০১৮৭১০৯৯৬২৩, ০১৭৫৫৯৬৬৩৪৪, ০১৮১২-৭৬০৭৮৩) চালু করেছে।

এদিকে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ের চারটি মেগা প্রকল্প চলমান থাকলেও তার সুফল পাচ্ছেন না নগরবাসী।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনার অভাব, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই না করা এবং শহরের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করার কারণে এই স্থবিরতা। আইইবির (চট্টগ্রাম কেন্দ্র) সাবেক সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, "জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা ৫ মিটার পর্যন্ত বাড়ে, অথচ অনেক আবাসিক এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২-৩ মিটার উঁচুতে। এছাড়া শহরটি তার ১০৪টি খালের মধ্যে ৪৭টিই হারিয়ে ফেলেছে।"

সবচেয়ে বড় উদ্যোগ সিডিএ’র খাল উন্নয়ন প্রকল্প (ব্যয় বেড়ে বর্তমানে ৮,৬২৬ কোটি টাকা) ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় বর্ধিত করা হলেও গত এপ্রিল থেকে মাঠপর্যায়ের কাজ বন্ধ রয়েছে।

সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনুদ্দিন বলেন, "প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ। তবে বর্ষায় পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে মাটির অস্থায়ী বাঁধ অপসারণের সরকারি নির্দেশনার পর কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে, যা অক্টোবর মাসের আগে আর শুরু করা সম্ভব নয়।"* ফলে চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও আগ্রাবাদের মতো এলাকাগুলো এই বর্ষায় চরম অরক্ষিত অবস্থায় থাকছে।

তবে সকালে জলাবদ্ধ পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দাবি করেন, নালা পরিষ্কারের আগাম পদক্ষেপ এবং মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির কারণে সামগ্রিক জলাবদ্ধতা অতীতের তুলনায় ৮০ শতাংশ কমেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *