১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 10 Feb, 2026
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দিনটি একটি নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ‘মনসুন বিপ্লব’ বা জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ১৮ মাস পর, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
তবে এটি নিছক ক্ষমতার পালাবদলের নির্বাচন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাষ্ট্র সংস্কারের সাংবিধানিক গণভোট, যা দেশটির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণ করবে।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, নতুন রাজনৈতিক জোটের উত্থান, তীব্র তথ্যযুদ্ধ এবং সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচনী প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।
১৫ বছরের শাসনামলের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনা পরবর্তীতে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় এবারের নির্বাচনে এক বিশাল রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এই শূন্যতা পূরণে প্রধানত দুটি শক্তি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে: দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং দলের সাংগঠনিক শক্তি বিএনপিকে এই নির্বাচনের প্রধান দাবিদার করে তুলেছে।
জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের প্রায় ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। দলটি তাদের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভোটারদের কাছে স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে।
তৃতীয় শক্তির উত্থান (জামায়াত-এনসিপি জোট): নির্বাচনের মাঠে সবচেয়ে বড় চমক হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্র আন্দোলনের ফসল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ (এনসিপি)-এর নেতৃত্বে গঠিত ১১-দলীয় জোট। আদর্শগতভাবে ভিন্ন মেরুর হলেও, কৌশলগত কারণে এবং ভারতীয় প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নে এই দুই দল একজোট হয়েছে।
এনসিপি নেতারা একে ‘আধিপত্যবাদী শক্তি’র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ হিসেবে দেখছেন। তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের ‘শৃঙ্খল’ এবং এনসিপির ‘বিপ্লবী’ ভাবমূর্তি প্রভাব ফেলছে।
এবারের নির্বাচনের ব্যালটে প্রার্থীদের নামের পাশাপাশি ভোটাররা একটি ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের মুখোমুখি হবেন। এর উদ্দেশ্য হলো ‘জুলাই চার্টার’-এর পক্ষে গণম্যান্ডেট বা জনসমর্থন আদায়।
এই চার্টারে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতার মতো ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।
হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে নবনির্বাচিত সংসদ পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়নে সাংবিধানিক পরিষদ হিসেবে কাজ করতে বাধ্য থাকবে। এটি বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের পথ সুগম করবে।
রয়টার্স ও বিভিন্ন সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, ভোটারদের মনের প্রধান ইস্যুগুলো আদর্শিক নয়, বরং অস্তিত্বুসংক্রান্ত: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে তলানিতে থাকা বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে ‘দুর্নীতি দমন’ এখন এক নম্বর দাবি।
বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই এটিকে তাদের প্রচারণার হাতিয়ার করেছে।
জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশে পৌঁছানোয় জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ভোটারদের দ্বিতীয় প্রধান উদ্বেগ।
জনসংখ্যার ৪০ শতাংশই তরুণ (৩০ বছরের নিচে)। তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা পরবর্তী সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, নির্বাচনকে ঘিরে এক নজিরবিহীন ‘ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার’ বা তথ্যযুদ্ধ চলছে।
ডিপফেক ভিডিও, বট-এর মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করা এবং সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়ানো হচ্ছে। ড. ইউনূস স্বয়ং জাতিসংঘে বিদেশি বিভ্রান্তিকর তথ্যের ‘বন্যা’ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
‘রিউমার স্ক্যানার’–এর তথ্যমতে, ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ভুয়া খবর প্রচারের প্রবণতা দেখা গেছে। অন্যদিকে, জামায়াত নেতাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করার পেছনেও বিদেশি ম্যালওয়্যারের উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াশিংটন জামায়াতের উত্থানকে পর্যবেক্ষণ করছে, অন্যদিকে ভারত বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ এখন পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এপির রিপোর্ট অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তির পাশাপাশি শঙ্কাও কাজ করছে।
জুলাই বিপ্লবে নারীদের অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা হতাশাজনক। জামায়াতের রক্ষণশীল রাজনীতি নারীদের কর্মসংস্থান ও স্বাধীনতায় বাধা হতে পারে কি না, তা নিয়ে ওয়াসিমা বিনতে হুসাইনের মতো তরুণীরা উদ্বিগ্ন।
হিন্দু সম্প্রদায় ও সাধারণ নাগরিকদের মনে এখনো সহিংসতার ভয় রয়েছে। নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
গণতন্ত্রের লিটমাস টেস্ট
১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন কেবল একটি সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি ‘লিটমাস টেস্ট’। নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলিমের মতে, সহিংসতা কমিয়ে আনা এবং সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
এখন দেখার বিষয়, ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার কি জুলাই চার্টারের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে, নাকি পুরনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অস্থিতিশীলতার চক্রেই দেশ আবর্তিত হবে। বাংলাদেশের জনগণ আগামীর সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

