হিমালয়ে প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়: মৃত্যুমিছিল ছাড়াল ৭৫০, নিখোঁজ ৩ সহস্রাধিক মানুষ
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 30 Aug, 2026
কাঠমান্ডু/বেইজিং প্রতিনিধি:
প্রকৃতির এক আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক রূপ প্রত্যক্ষ করল হিমালয় অঞ্চল। চীন-নেপাল সীমান্তের লাংটাং লিরুং চূড়ার কাছে বিশালাকার হিমবাহের আকস্মিক ধস ও তুষারপাতে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নেপাল ও তিব্বতজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র ফুটে উঠেছে।
গত এক দশকের মধ্যে এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ।
উদ্ধার তৎপরতা পঞ্চম দিনে পদার্পণ করলেও বিরূপ আবহাওয়া, অবিরাম বৃষ্টি এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে জীবিতদের উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
বুধবার সকালে সীমান্ত সংলগ্ন তিব্বত অংশে প্রায় ৭,২০০ মিটার উঁচুতে থাকা লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের দক্ষিণ ঢালে হিমবাহটি হঠাৎ ধসে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, ভেঙে পড়া হিমবাহের অংশটি বিপুল শক্তিতে উপত্যকায় আছড়ে পড়লে ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য ভূকম্পন সৃষ্টি হয়। এর ফলে বরফ, কাদা ও দানবীয় পাথরের স্রোত নেমে এসে ত্রিশূলী ও ভোতে কোশী নদীর মাধ্যমে প্রায় ১০০ কিলোমিটার ভাটি পর্যন্ত ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই পানির তোড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় সীমান্তের একের পর এক গ্রাম, জনপদ, যোগাযোগ সড়ক এবং একাধিক বড় অবকাঠামো।
সবচেয়ে বড় মানবিক ট্র্যাজেডি রচিত হয়েছে নেপালের অংশে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৭৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্যমতে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় ২,৪৯৮ জন। ওদিকে সীমান্তের ওপারে তিব্বতের গিরোং কাউন্টিতে চীনা কর্তৃপক্ষ ১৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে এবং সেখানে আরও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। পবিত্র কৈলাশ পর্বত অভিমুখে তীর্থযাত্রায় যাওয়া শত শত বিদেশি পর্যটক দুর্যোগের মূল কেন্দ্রস্থল গিরোং বন্দর ও ইমিগ্রেশন সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন।
চীনের রাষ্ট্রীয় তথ্য অনুযায়ী নিখোঁজদের মধ্যে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন; যার মধ্যে ১০৪ জন নেপালি, ৪৯ জন ভারতীয়, ১৮ জন আমেরিকান, ১৫ জন ব্রিটিশ ও ৬ জন অস্ট্রেলীয় পর্যটক রয়েছেন। ভারত থেকে যাওয়া তীর্থযাত্রীদের মধ্যে তামিলনাড়ুরই প্রায় ১০০ জনের কোনো সন্ধান মিলছে না।
ভাটিতে অবস্থিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। ত্রিশূলী ৩এ-সহ বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের টানেলের ভেতরে ১০০ জনেরও বেশি শ্রমিক এখনো ঘন কাদার নিচে আটকা পড়ে আছেন। প্রায় ৯৩৩ জন প্রকল্প কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নেপালি সেনাবাহিনী টানেলে পাইপ ঢুকিয়ে ভেতরে বাতাস পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও রাতভর বৃষ্টি ও নদীর পানি বাড়ায় কাজ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ২০ হাজার নিরাপত্তা কর্মী মাঠে নেমেছেন। এছাড়া টানেল উদ্ধার ও ফরেনসিক অনুসন্ধানে পারদর্শী ভারত ও চীনের বিশেষ বিশেষজ্ঞ দল উদ্ধারকাজে যোগ দিয়েছে। দুর্গম পথ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় হেলিকপ্টার ও ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গতদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে জাতিসংঘ ও স্থানীয় প্রশাসন।উদ্ধারকর্মীদের জন্য বড় আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে নতুন করে বন্যার ঝুঁকি। নদীর স্বাভাবিক গতিপথে ভূমিধসের বর্জ্য জমে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয়েছে একাধিক "ব্যারিয়ার লেক" বা কৃত্রিম বাঁধ। শনিবার ড্রোনে নতুন আরেকটি বাঁধের সৃষ্টি শনাক্ত হওয়ার পর সীমান্ত এলাকার উদ্ধারকর্মীদের অবিলম্বে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এই কৃত্রিম হ্রদ উপচে পানি লোকালয়ে আঘাত হানার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। সোমবার পর্যন্ত ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় নতুন করে ধসের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না ভূবিজ্ঞানীরা।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ICIMOD) ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণেই হিমালয়ের পারমাফ্রস্ট ও বরফের বাঁধন মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ২০০০ সালের পর থেকে এ অঞ্চলে বরফ গলার হার দ্বিগুণ হয়েছে, যা পাহাড়ের প্রাকৃতিক স্থায়িত্ব ধ্বংস করে এমন বিপজ্জনক তুষার ও কাদা ধসের আশঙ্কা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রেড ক্রস সতর্ক করেছে যে এই দুর্যোগে ৯৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত ও খাদ্য সংকটে পড়তে পারেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন জরুরি মানবিক সহায়তার বড় তহবিল ঘোষণা করেছে। ধ্বংসস্তূপের মাঝে যখন আশা আর আশঙ্কার দোলাচল চলছে, তখন সীমান্তজুড়ে প্রিয়জনদের অপেক্ষায় থাকা হাজারো পরিবারের একটাই প্রার্থনা—কাদার গভীর থেকেও যদি ফিরে আসে কোনো অলৌকিক প্রাণের স্পন্দন।
নেপালে নিখোঁজ এক অস্ট্রেলীয় ব্যক্তির বোন জানিয়েছেন, তারা "আশা ধরে রাখছেন, তবে পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, তার জন্য নিজেদের মনকেও প্রস্তুত করছেন।"
নিউ সাউথ ওয়েলসের আউটডোর শিক্ষক মাইকেল কিটস প্রথমে দুর্যোগ কবলিত এলাকার বাইরে ছিলেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। তবে পরে স্বজনেরা জানতে পারেন, দুর্যোগ আঘাত হানার সময় তিনি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ইমিগ্রেশন সেন্টারে উপস্থিত ছিলেন।
তার বোন ক্যারেন হেইলি তাকে "জীবনের মূল আলো" হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, মাইকেল "কৈলাশ পর্বতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক আধ্যাত্মিক তীর্থযাত্রার অংশ হিসেবে" নেপাল ভ্রমণ করছিলেন।
ইনস্টাগ্রামে তিনি লেখেন, "এটি এমন একটি যাত্রা ছিল যার জন্য মাইকেল দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা ও স্বপ্ন দেখছিল এবং তীব্র আকাঙ্ক্ষা করছিল।"
তিনি আরও লেখেন, "আমরা অত্যন্ত বেদনার সাথে বুঝতে পারছি যে মাইকেলের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা হয়তো খুবই ক্ষীণ, তবুও আমাদের পরিবার উত্তরের জন্য অধীর অপেক্ষায় রয়েছে।"
তিনি যোগ করেন যে, তাদের পরিবার "আশা ধরে রাখছে, পাশাপাশি যেকোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে নিজেদের মনকেও প্রস্তুত করছে।"
তিব্বতে দুর্যোগের প্রকৃত মাত্রা নিরূপণ করা কেন কঠিন
১৯৫০-এর দশকে চীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া তিব্বত দেশটির অন্যতম কঠোর নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল।
এটি দীর্ঘদিন ধরে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছে এবং বেইজিং যেকোনো ধরনের বিক্ষোভ বা অস্থিরতার আশঙ্কায় সেখানে কড়া নজরদারি বজায় রাখে।
এ কারণেই শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ এসেছে এবং প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বড় কোনো দুর্যোগের পরপরই তার এমন সফর বিরল।
তিব্বতে প্রবেশের জন্য বিশেষ ভিসার প্রয়োজন হয় এবং বিদেশি গণমাধ্যমের জন্য সেখানে প্রবেশাধিকার পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, বললেই চলে অসম্ভব। সেখানকার সাধারণ মানুষের সাথে যোগাযোগ করাও সমান কঠিন।
এর ফলে সেখানে আসলে কী ঘটছে তা জানা আমাদের পক্ষে ভীষণ জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আমাদের মূলত চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
নেপাল হয়ে তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা তীর্থযাত্রীদের চারটি পৃথক অনুমতির প্রয়োজন হয়, যার মধ্যে চীনা সামরিক বাহিনীর বিশেষ অনুমতিও অন্তর্ভুক্ত।
ভূমিধসের পর নতুন ব্যারিয়ার লেক সৃষ্টি, চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বিদ্যমান ব্যারিয়ার লেকের ভাটিতে ভূমিধস হওয়ার পর তিব্বতে একটি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে।
ব্যারিয়ার লেক হলো এমন একটি জলাশয়, যা নদী বা প্রবাহের গতিপথে ধ্বংসাবশেষ জমে প্রাকৃতিকভাবে বাঁধ তৈরি হলে সৃষ্টি হয়। আকস্মিক বন্যার পর সৃষ্টি হওয়া পূর্ববর্তী হ্রদটি আরও বন্যার ঝুঁকি কমাতে প্রাকৃতিকভাবে খালি হচ্ছিল বলে জানা গিয়েছিল।
চায়না সেন্ট্রাল টিভি (সিসিটিভি) জানায়, শনিবার নজরদারি ড্রোনে একটি ভূমিধস ধরা পড়ে, যার ধ্বংসাবশেষ প্রবাহকে আটকে দিয়ে নতুন একটি ব্যারিয়ার লেকের জন্ম দেয়।
ল্যান্ডস্লাইডটি প্রুকপু ছিয়াং সাংপো (Pruqpu Qiang Zangbu) নদীর ব্যারিয়ার লেক থেকে প্রায় ২.৮ কিলোমিটার (১.৭ মাইল) ভাটিতে ঘটেছে বলে জানা গেছে।
চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য দ্রুত বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করেছে এবং গিরোং (Gyirong) বন্দরের কাছের উদ্ধারকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজে নিয়োজিত প্রায় ২০,০০০ নিরাপত্তা বাহিনী – সর্বশেষ পরিসংখ্যান
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে, যা গতকাল ছিল ৬৭৫ জন।
গত এক ঘণ্টায় নেপাল পুলিশও ৭৩৪টি মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
পুলিশের দেওয়া অন্যান্য তথ্য:
নিখোঁজ: ২,৪৯৮ জন
উদ্ধার: ৮,১৮৬ জন
আহত: ২৪২ জন (হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়া ব্যক্তিরাসহ)
মোতায়েনকৃত নিরাপত্তা কর্মী: ১৯,৮৯৫ জন
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

