:

স্থবির বন্দর, অশান্ত শিল্পাঞ্চল ও জ্বালানির আঁধার: গভীরতর সংকটের ঘূর্ণাবর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতি

top-news

বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক নজিরবিহীন ও চতুর্মুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে রাজপথের শিল্পাঞ্চল এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা পর্যন্ত। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রমহ্রাসমান ক্রয়ক্ষমতা, জ্বালানি সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা মিলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার জন্ম দিয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অর্থনীতি মূলত এক ধরনের মন্দা পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই যাচ্ছে; যেখানে প্রবৃদ্ধির গতি ধীর, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মজুরি সূচকের প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো এক গভীর ও জটিল সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থনীতির এই মন্থরতার সবচেয়ে বড় ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলছে দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের বিস্তারিত পরিসংখ্যানে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই বন্দরে মাসভিত্তিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে কমছে। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ লাখ ৯৮ হাজার ৬০১ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও আগস্টে তা কমে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৪ টিইইউ এবং সেপ্টেম্বরে তা আরো কমে ২ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৩ টিইইউতে নেমে আসে।

সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে মোট ৮ লাখ ৬৩ হাজার ২৭৮ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ কম। টার্মিনালভিত্তিক পতনের চিত্রটি আরো ভয়াবহ। চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনালে (সিসিটি) গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং ১ লাখ ১৩ হাজার টিইইউ থেকে প্রায় ২২ শতাংশ কমে ৮৮ হাজার ৫০৪ টিইইউতে নেমেছে।

অন্যদিকে জেনারেল কার্গো বার্থে (জিসিবি) হ্যান্ডলিং ৩ লাখ ১৩ হাজার ৯১৪ টিইইউ থেকে প্রায় ২৮ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৯ টিইইউতে।

বন্দরের এই স্থবিরতার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের শুল্কায়িত আমদানির নিম্নগামী প্রবণতাও চরম উদ্বেগের। সেপ্টেম্বরে কাস্টম হাউসে ৯০ লাখ ৮৩ হাজার টন পণ্য শুল্কায়ন হয়েছিল, যার মূল্য ছিল ৪৮ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। কিন্তু অক্টোবরে তা কমে দাঁড়ায় ৭৫ লাখ ৪৯ হাজার টনে এবং শুল্কায়িত মূল্য নেমে আসে ৪০ হাজার ৯১১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক মাসের ব্যবধানে আমদানি কমেছে প্রায় ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ।

গত বছরের অক্টোবরের (৯১ লাখ ৬৫ হাজার টন) সঙ্গে তুলনা করলে এক বছরের ব্যবধানে শুল্কায়িত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং মূল্য ১০ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি কমে যাওয়ার এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে দেশে নতুন বিনিয়োগ বা শিল্প সম্প্রসারণ কার্যত থমকে আছে।

মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা এবং বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের রহস্যজনক ঘাটতি। বিপিসির নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা ৫৬টি জাহাজের বিল অব লেডিং (বিএল) অনুযায়ী জ্বালানির পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৫১ হাজার ৯২৮ দশমিক ৮৪২ টন, কিন্তু খালাস হয়েছে ১৭ লাখ ৪৯ হাজার ৪৭৯ দশমিক ৩৫৭ টন। অর্থাৎ ২ হাজার ৪৪৯ দশমিক ৪৮৫ টন বা প্রায় ২৯ লাখ ৬৫ হাজার লিটার জ্বালানি তেল কম পাওয়া গেছে, বর্তমান বাজারদরে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি মিলেছে হাই স্পিড ডিজেলে (এইচএসডি), যা ২ হাজার ২৬ দশমিক ৪৫৮ টন বা প্রায় ২৪ লাখ ৩ হাজার ৩৭৯ লিটার কম পাওয়া গেছে।

এছাড়াও পেট্রল ও অকটেনে ২৮১ দশমিক ৭৮৯ টন এবং জেট এ-১ জ্বালানিতে ১৪১ দশমিক ২৩৮ টন ঘাটতি পাওয়া গেছে। নির্দিষ্ট কিছু জাহাজের হিসাব আরো উদ্বেগজনক— এমটি টর্ম অ্যাগনেস থেকে ২৬৩ দশমিক ৪৬৩ টন, এমটি টর্ম লুইস থেকে ২২১ টন, এমটি লিয়ান সং হু থেকে ২১৪ টন এবং পিভিটি সোলানা থেকে ২০৬ টন মোটর অয়েল ঘাটতি পাওয়া যায়। স্বয়ংক্রিয় পরিমাপ ব্যবস্থা বা অটোমেশনের অভাবে খালাস ও সরবরাহের প্রতিটি ধাপে ঘটা এই পদ্ধতিগত চুরি শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহকে আরো সংকটাপন্ন করে তুলছে।

অর্থনীতির এই কাঠামোগত সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্পাঞ্চলের চরম অস্থিরতা, যা রফতানি আয়ের প্রধান স্তম্ভকে সরাসরি আঘাত করছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে আয়ের বিস্তর ফারাক তৈরি হওয়ায় রাজপথে নেমে আসা পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও ভাংচুরের জেরে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হতে হয়েছে অন্তত ৪৬৯টি পোশাক কারখানায়।

এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সরবরাহ চেইন বিপর্যস্ত হওয়ায় প্রবাসী আয় ও জনশক্তি রফতানি খাত প্রবল অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক গোলকধাঁধায় আটকে আছে, যেখান থেকে উত্তরণে খণ্ডকালীন পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। বন্দর, কাস্টমস ও বিপিসির জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিপূর্ণ স্বচ্ছতা ও অটোমেশন নিশ্চিত করার পাশাপাশি জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৌশলগত মজুদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে এই চতুর্মুখী সংকট দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী খাদের দিকে ঠেলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *