:

দেশে ৩ কোটি ১০ লাখ মধ্যবিত্ত দরিদ্রতার ঝুঁকিতে: বাড়ছে আয় বৈষম্য-পিপিআরসি

top-news

বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার বদলে বাড়ছে, মধ্যবিত্ত শ্রেণি আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে এবং খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর সক্ষমতা তার কাঠামোগত সীমায় পৌঁছে গেছে। দেশে ২০২৫ সালে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ছিল প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। এছাড়া ২০২২ সালের তুলনায় বেড়েছে দারিদ্র্য। গত বছর দরিদ্রতার হার ছিল ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যর হার ছিল ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

রাজধানীর চামেলী হাউজের সিরডাপ মিলনায়তনে আজ বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনা ‘স্টেট অব দ্য রিয়েল ইকোনমি: ডাইনামিক্স অব রিভার্সালস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’-এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। বইটি যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন হোসেন জিল্লুর রহমান এবং নামিরা শামীম।

অনুষ্ঠানে পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক হোসেন জিল্লুর রহমান উল্লেখ করেন, দারিদ্র্যের বিপরীতমুখী প্রবণতা এবং মধ্যবিত্তের ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুরতার বিষয়ে পিপিআরসি ও বিশ্বব্যাংকের তথ্যে মিল পাওয়া গেছে। পিপিআরসির জাতীয় প্রতিনিধিত্বমূলক জরিপ অনুযায়ী, মাঝারি দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং একই সময়ে চরম দারিদ্র্য ৫ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

প্রকাশিত গবেষণায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, দরিদ্র্যতার পাশাপাশি বৈষম্যও বেড়েছে। ব্যয়ভিত্তিক গিনি সহগ বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৩৬ হয়েছে। প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বা ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে রয়েছে। যারা দারিদ্র্যসীমা ও মধ্যম আয়ের স্তরের মাঝামাঝি জীবনযাপন করছে এবং স্থবির আয়, ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ ও অর্থনৈতিক ধাক্কার কারণে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক পরিবারেই অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে আক্রান্ত, যার ফলে ওষুধ ও চিকিৎসায় তাদের নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। পিপিআরসি পরিবারভিত্তিক তথ্য এবং মধ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র সমন্বয় করে জোর দিয়ে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি কেবল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কার বন্দি নয়, বরং এটি একটি ‘উচ্চ দারিদ্র্য-নিম্ন বিনিয়োগ-নিম্ন প্রবৃদ্ধি’র কাঠামোগত ফাঁদে আটকে গেছে।

অনুষ্ঠানে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং সংস্কারহীন প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ফাঁদকে অবিলম্বে স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক গণতন্ত্র, নতুন প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, উৎপাদনশীলতার রূপান্তর এবং দ্রুত ফলাফলের জন্য শাসনব্যবস্থার সংস্কার—এই পাঁচটি স্তম্ভের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ট্রানজিশন কমপ্যাক্টের (সংক্রান্তিকালীন সমঝোতা) তৈরি করতে হবে। রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নে বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে পরিস্থিতি পর্যালোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি হয়রানিকে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থার জুড়ে একটি সর্বব্যাপী অভিজ্ঞতা হিসেবে চিহ্নিত করে। যা মানুষের শক্তি, উদ্যোগ ও স্বপ্নকে ধ্বংস করে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসনের একটি হয়রানিমুক্ত বাস্তবতা অর্জনকে কাঠামোগত সংস্কারের মূল কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে।’

অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জঁ পেম বলেন, ‘অর্থনীতির সামনে থাকা প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাণিজ্য, পাবলিক ফাইন্যান্স এবং জ্বালানি দক্ষতায় অবিলম্বে কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। সরবরাহের ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে শ্রমবাজার ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে আয় বৈষম্য দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে এবং প্রবৃদ্ধি আগের মতো মানুষকে দ্রুত দারিদ্র্যমুক্ত করতে পারছে না। যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালের পর দেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে কোনো খানা আয়-ব্যয় জরিপ হয়নি। ফলে ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেলের বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। ওই জরিপের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দারিদ্র্যসীমা মাত্র ১৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যসূচক বা সিপিআই ২২ শতাংশের মতো বেড়েছে। ফলে প্রকৃত দারিদ্র্যের হার আরো অনেক বেশি হবে, যা পিপিআরসির গবেষণায় উঠে এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘শীর্ষ ১০ শতাংশ ও সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত বা পালমা রেশিও ২০২২ সালের জরিপে ছিল ৩ দশমিক ২। কিন্তু পিপিআরসির তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করে দেখেছি, এটি এখন ৭ দশমিক ২। এর অর্থ হলো, দেশে আয়বৈষম্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এখানে আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিম্ন ভারসাম্যের ফাঁদ। সরকারের রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় তারা ব্যয় বাড়াতে পারছে না। এই ফাঁদ থেকে বের হতে না পারলে আমরা সত্যিকার অর্থেই বড় বিপদে পড়ব। এছাড়া প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমে গেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’

এফবিসিসিআইর প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘বিগত বিশ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাত দাঁড়াতে পারেনি এবং আমাদের আরএমজি রফতানির ওপর নির্ভরতা ৭৩-৭৫ থেকে বেড়ে ৮৪-৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, ডিগ্রি এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না এবং জেন-জি প্রজন্ম একটি সাধারণ পারমিটের জন্য সরকারি অফিসে ৩০-৪০ বার যাওয়া সহ্য করবে না।’

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা না থাকায় কঠিন জীবনযাপন করছেন। তৈরি পোশাক খাতে নারী কর্মসংস্থান হ্রাস পাওয়ার কারণে আমাদের বিকল্প কৃষি-পরিবেশগত চাকরি, শিশু যত্ন কেন্দ্র এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল বিনিয়োগ প্রয়োজন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *