:

মূল্যস্ফীতির আগুনে নতুন ঘি: জ্বালানির রেকর্ড দাম বৃদ্ধি

top-news

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংকটের সরাসরি মাশুল গুনছে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতি ও দেশের সাধারণ মানুষ।

বিশ্ব জ্বালানি তেলের বাজার এই মুহূর্তে এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রেন্ট ক্রুড বর্তমানে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করছে, যা গত ১৯ সেপ্টেম্বর ছিল ১০৩.৮৭ ডলার। অন্যদিকে, ডব্লিউটিআই ক্রুড ঘোরাফেরা করছে ৯৫-৯৯ ডলারের কাছাকাছি। অথচ মাত্র দেড়-দুই মাস আগেও, আগস্টের শুরুর দিকে, এই দুই বেঞ্চমার্কের দাম ছিল ৭৬-৮০ ডলারের ঘরে—অর্থাৎ স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববাজারে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গেছে।

আজ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা নিম্নমুখী প্রবণতা দেখালেও আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল ৯৫ থেকে ১০৪ ডলারের মধ্যে বেচাকেনা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং ওপেকের সরবরাহ হ্রাসের সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্ববাজার উত্তপ্ত হলেও, চীনের মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে তেলের সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এটি দামকে এক প্রকার স্থিতিশীল কিন্তু উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ স্তরে ধরে রেখেছে।

তবে এই বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণের সমীকরণের চেয়েও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে আকস্মিক এক নীতিগত সিদ্ধান্ত।

দেশীয় বাজারে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ঘাটতি ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভর্তুকি প্রত্যাহারের শর্তের প্রেক্ষিতে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেন—চার ধরনের প্রধান জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি এক ধাক্কায় ২০ টাকা করে বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন এই দামে ডিজেল লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। শতাংশের হিসাবে এই বৃদ্ধি ডিজেলে প্রায় ১৭.৪%, কেরোসিনে ১৪.৮%, পেট্রোলে ১৪.৩% এবং অকটেনে ১৩.৮%।

মন্ত্রণালয় এর কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও জাহাজভাড়া বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ক্রমবর্ধমান লোকসানের কথা উল্লেখ করেছে। এটি চলতি বছরে দ্বিতীয় বড় মূল্য সমন্বয়।

এর আগে গত এপ্রিলে ডিজেলে লিটারপ্রতি ১৫ টাকা এবং অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনে যথাক্রমে ২০, ১৯ ও ১৮ টাকা বাড়ানো হয়েছিল এবং মে মাসে ডিজেল অপরিবর্তিত রেখে বাকি তিনটির দাম আরও ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস দাম স্থিতিশীল রাখার পর সেপ্টেম্বরে এসে সরকারকে ফের এই বড় ধাক্কা দিতে হলো।

হঠাৎ নেওয়া এই চরম সিদ্ধান্ত দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘ডোমিনো ইফেক্ট’ বা চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করেছে, যা উৎপাদন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত প্রতিটি স্তরকে মারাত্মকভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে। লিটারপ্রতি ২০ টাকার এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি বাংলাদেশের বর্তমান উচ্চ-মুদ্রাস্ফীতির আগুনে নতুন করে ঘি ঢেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, আগস্ট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৮.২৬ থেকে ৮.২৯ শতাংশের মধ্যে, যেখানে খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার মূল্যস্ফীতি ছিল খাদ্যের চেয়েও বেশি—প্রায় ৯.৩ শতাংশ, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। অলরেডি ডাবল-ডিজিট ছুঁইছুঁই সাধারণ মূল্যস্ফীতি এই জ্বালানির ধাক্কায় আগামী মাসগুলোতে আরও ২ থেকে ২.৫ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম বাড়লে তা কেবল গাড়ির জ্বালানির খরচের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি সরাসরি ডিজেলচালিত কৃষি সেচ, পণ্য পরিবহন এবং কারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয়। পরিবহন ব্যয় সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে যুক্ত হয়ে চূড়ান্তভাবে বাজারের দামে প্রতিফলিত হয়, যা সরাসরি খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।

দেশের মোট পণ্য পরিবহনের প্রায় ৮০ শতাংশই সড়ক ও নৌপথের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রধান জ্বালানি ডিজেল। লরি, ট্রাক ও কার্গো ভেসেলের ভাড়া এক রাতে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। এর প্রত্যক্ষ শিকার দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, যাদের আয়ের একটি বড় অংশই চলে যায় খাদ্য ও নিত্যপণ্য ক্রয়ে।

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে এই প্রভাব সবচেয়ে নিষ্ঠুরভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। এমনিতেই সবজি ও ডিমের দাম বাড়তি, তার ওপর বাজারে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল উধাও হয়ে যাওয়া আর খোলা তেলের দাম চড়া থাকার খবরও সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হওয়া মানে বাজারে নতুন করে অস্থিরতার বীজ বোনা।

দেশের কৃষি খাতের একটি বিশাল অংশ বোরো ও আমন চাষের জন্য সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রধানত ডিজেল দিয়ে চলে। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বিঘাপ্রতি প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেড়ে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে এবং কৃষকদের ঋণগ্রস্ততা আরও বাড়িয়ে দেবে।

জ্বালানি সংকটের আঁচ সবচেয়ে নাটকীয়ভাবে পড়েছে বিদ্যুৎ খাতে। গ্যাস ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি মেগাওয়াট লোডশেডিং হচ্ছে, কোনো কোনো দিন যা সাড়ে তিন হাজার সাতশ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক এক দিনে গড় বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট, অথচ তার বিপরীতে গড়ে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে—যেখানে ঢাকা অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ৫৪৭ মেগাওয়াট এবং সিলেট, ময়মনসিংহ ও খুলনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ। লোডশেডিং সামাল দিতে সরকার ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে, যা উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় নিজেই স্বীকার করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাংলাদেশ শঙ্কায় রয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দেড় থেকে দুই মাস কমবেশি লোডশেডিং চলমান থাকবে, কোনো কোনো সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

যে পরিবারের মাসিক আয়ের সিংহভাগ এমনিতেই চাল-ডাল-তেল-সবজি কিনতেই শেষ হয়ে যায়, তাদের জন্য পরিবহন ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও বাজারদর—তিন দিক থেকে একযোগে চাপ আসা মানে সংসার চালানোর হিসাব পুরোপুরি ওলটপালট হয়ে যাওয়া। নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষক—যাদের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমান তালে বাড়ে না, তাদের জন্য এই সময়টা হয়ে উঠছে টিকে থাকার এক কঠিন লড়াই।

বিপিসির লোকসান ঠেকাতে গিয়ে সরকার যে মূল্য সমন্বয়ের পথ বেছে নিয়েছে, তা স্বল্পমেয়াদে রাষ্ট্রীয় কোষাগার রক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ, পরিবহন, কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারে যে চাপ তৈরি করছে, তার সামগ্রিক প্রভাব এখনো পুরোপুরি প্রকাশ পায়নি।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি যদি না মেটে, তাহলে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশকে আরও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা—আর ততদিন পর্যন্ত এই ভার বহন করে যেতে হবে সেই সাধারণ মানুষদেরই, যাদের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতা নেই, শুধু সয়ে যাওয়া ছাড়া।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *