:

নিয়োগ-পদায়নে শত কোটি টাকার বাণিজ্য, চার দেশে পাচার ১১ হাজার কোটি

top-news

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া এবং স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার এবং নিয়োগ-বদলি ও পদায়নে কোটি কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ তানজির আহমেদ এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি অনুসন্ধান চলমান রয়েছে, নতুন প্রাপ্ত এই গুরুতর অভিযোগগুলো সেই চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গেই যুক্ত করে বিস্তারিত খতিয়ে দেখা হবে।

দুদকের কাছে আসা নতুন অভিযোগ অনুযায়ী, আসিফ মাহমুদ দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ড—এই চার দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। এর মধ্যে দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

এসব পাচারকৃত অর্থ দিয়ে তিনি পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দুই বোনজামাই ও এক ভাগনের মাধ্যমে অত্যন্ত সুকৌশলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে।

পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করে হেলিকপ্টার ভ্রমণ, পাঁচ তারকা হোটেল ওয়েস্টিনে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস এবং দামি গাড়ি ব্যবহারের মতো বিলাসী জীবনযাপনের অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিদেশে অর্থ পাচারের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বড় বড় নিয়োগ ও বদলিতে প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য পেয়েছে দুদক।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগে ১০ কোটি টাকা, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগের বিনিময়ে ৬৫ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এর বাইরে সারা দেশে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নে জনপ্রতি ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন এবং ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে এই সাবেক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে।

মেগা প্রকল্পগুলোতেও আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং সেতু নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে দুদকের নথিতে।

কেবল আসিফ মাহমুদ নন, তার বাবা বিল্লাল হোসেন এবং ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে।

তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষের তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।

গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ শুরু থেকেই দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছেন আসিফ মাহমুদ।

রোববার দুদকের এই সংবাদ সম্মেলনের পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি হাস্যরসাত্মকভাবে লেখেন, ‘অনুসন্ধানে বিদেশে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন, চলতে কষ্ট হচ্ছে।’

এর আগেও গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিক হয়রানি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং অভিযোগের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে দুদকের এক কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশও পাঠান।

২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া আসিফ মাহমুদ ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন এবং বর্তমানে তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *