বিলের মাছে মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক, মানবদেহে প্রবেশের শঙ্কায় গবেষকরা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 31 Aug, 2026
দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক জলাভূমি আড়িয়াল বিলের দেশি মাছে উদ্বেগজনক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক।
শুধু মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় নয়, মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাংসপেশিতেও মিলেছে এই অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা, যা জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টিকে করে তুলেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ।
বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আড়িয়াল বিলের পাঁচটি স্থান—গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর—থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ১৫০টি দেশি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরীক্ষায় ব্যবহৃত মাছগুলো ছিল কই, বাটা, মেনি (ভেদা/নান্দিনা), গুলশা টেংরা ও পুঁটি।
গবেষণায় দেখা গেছে, সব প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে জনপ্রিয় দেশি কই মাছে। তিন মৌসুমেই কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে, অন্ত্রে ১.৭০ থেকে ১.৯০টি এবং ফুলকায় ১.৩০ থেকে ১.৪০টি করে প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কই মাছ সর্বভুক ও তলদেশজীবী হওয়ায় পানির তলদেশ, পলিমাটি ও প্ল্যাঙ্কটনের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজে গ্রহণ করে ফেলে। এমনকি ৩০০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল অতিক্রম করে সরাসরি মাংসপেশিতেও পৌঁছে যেতে পারে। কই মাছের পরই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক মিলেছে বাটা মাছে, এরপর মেনি ও গুলশা টেংরায়। সবচেয়ে কম শনাক্ত হয়েছে পুঁটি মাছে।
শুধু মাছ নয়, বিলের পানি ও পলিমাটিতেও মিলেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্লাস্টিক কণা। প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১.৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২.৩৩ থেকে ১২৭.৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে, যেখানে বর্ষা মৌসুমে দূষণের মাত্রা ছিল সর্বোচ্চ।
গবেষকদের মতে, বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশপাশের জনবসতি, বাজার, কৃষিজমি ও নালা-খাল থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য বিলে এসে পড়ে, পরে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে তা তলদেশে জমে দীর্ঘমেয়াদি দূষণের উৎসে পরিণত হয়।
ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটি-আইআর) স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া কণার ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশই মাইক্রোফাইবার, যার প্রধান উৎস কাপড় ধোয়ার সময় নির্গত কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি এবং মাছ ধরার প্লাস্টিক জাল। এছাড়া পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিকার্বোনেটের মতো উপাদানও শনাক্ত হয়েছে, যেগুলো সাধারণত প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল ও প্যাকেজিং সামগ্রীতে ব্যবহৃত হয়।গবেষণায় ব্যবহৃত প্লাস্টিক লোড ইনডেক্স ও পলিমার হ্যাজার্ড ইনডেক্স অনুযায়ী আড়িয়াল বিলের পানি ও পলিমাটি বর্তমানে উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষকরা বলছেন, পলিমাটি থেকে ক্ষুদ্র জলজ প্রাণী, সেখান থেকে মাছ এবং সবশেষে মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরি হয়েছে। এর আগেও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, চলনবিল, হাওরাঞ্চল, সুন্দরবন উপকূল ও বঙ্গোপসাগরের মাছ-চিংড়িতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছিল। তবে আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটি নিয়ে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বলে দাবি গবেষকদের।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, "মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আড়িয়াল বিলের মাছের অন্ত্রের পাশাপাশি মাংসপেশিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে। হয়তো পাঁচ বা দশ বছরে নয়, ২৫ থেকে ৩০ বছর পর কিংবা পরবর্তী প্রজন্মেও এর প্রভাব প্রকাশ পেতে পারে।"
গবেষকরা অবশ্য বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা। এ লক্ষ্যে তারা নদী ও সংযোগ খালে বর্জ্য শোধনব্যবস্থা স্থাপন, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক সুতা ও জালের ব্যবহার বন্ধ, উন্মুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বিলসংলগ্ন এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করেছেন।
প্রায় ১৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের আড়িয়াল বিল থেকে আহরিত মাছ নিয়মিত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে বিক্রি হওয়ায় গবেষণার এই ফলাফল শুধু পরিবেশ নয়, দেশজুড়ে ভোক্তাদের জন্যও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল Journal of Hazardous Materials Advances-এ প্রকাশিত হয়েছে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

