বর্ষীয়ান রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 20 Aug, 2026
সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর ভোটের মাধ্যমে ফয়সালা হলো কে হবেন দেশের রাষ্ট্রপতি। নির্বাচনে ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণ শুরু হয় দুপুর ২টায় এবং শেষ হয় বিকেল ৫টায়।
নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন দুইজন— বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সমর্থিত এলডিপি প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
তাদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ৮৮ ভোট পেয়েছেন।
এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৩৪৯ জন, যাদের প্রত্যেকেই সংসদ সদস্য। তাদের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৩৪৩ জন। তবে স্বতন্ত্র সদস্য রুমিন ফারহানাসহ ৬জন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভােট দেননি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এই নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংসদে তাদের নির্ধারিত আসনে বসে ছিলেন এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ২০ জন কর্মকর্তা তাদের সহায়তা করেছেন ও ব্যালট পেপার সরবরাহ করেন। সংসদ সদস্যরা তিনটি স্বচ্ছ বাক্সে তাদের ব্যালট ফেলেছেন।
এক নজরে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রাবস্থায় ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে (ইপিএসইউ) যোগ দেন এবং সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এসএম হল ইউনিটের মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানকালে তিনি সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানো হয়।
মির্জা ফখরুল বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (শিক্ষা ক্যাডার) সদস্য হিসেবে ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর বেশ কয়েকটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেছেন।
১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে দেশব্যাপী এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় মির্জা ফখরুল বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির ৫ম জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুলকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ২০ মার্চ থেকে পাঁচ বছর দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-০১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০১ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও শপথ গ্রহণ করেননি।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মির্জা ফখরুল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। এই দম্পতির দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি ঠাকুরগাঁও নির্বাচনী এলাকা থেকে বেশ কয়েকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ সরকারের কৃষিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন
এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। ওই সময় বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট এবং ১৭২ ভোট পেয়ে ১১তম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস।
যে ৬ এমপি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেননি
জাতীয় সংসদের অধিবেশন কক্ষে আজ বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন জাতীয় সংসদের ৩৪৯ সদস্য। সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ভোটগ্রহণের পর গণনা শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন ফল ঘোষণা করেন।
তিনি জানান, বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ ৮৮ ভোট পেয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৩৪৯ জন এমপির মধ্যে ৩৪৩ জন ভোট দিয়েছেন।
সংসদ সচিবালয় ও ইসি সচিবালয়ের সূত্রে ভোট না দেওয়া ৬ সংসদ সদস্যের নাম জানা গেছে।
তারা হলেন—বিএনপির মির্জা আব্বাস, ওসমান ফারুক ও মোস্তফা কামাল পাশা।
আরও ভোট দেননি জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান এবং স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা। ভোটদানে বিরত থাকার বিষয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, এই নির্বাচন
অর্থহীন এবং প্রহসনের। ভোট না দেওয়ার পক্ষে তিনি তিনটি কারণ তুলে ধরেছেন। রুমিন ফারহানা বলেন, ‘আমার কাছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে অর্থহীন মনে হয়েছে।
কারণ, ভোটে অনিশ্চয়তা না থাকলে সেটা কোনো নির্বাচন নয়। এই ভোটের ফলাফল কী,
তা সবার জানা। তাহলে এটাকে ভোট কেন বলব। সুতরাং এটা মনোনয়ন, নির্বাচন নয়।’
রুমিন ফারহানা বলেন, ‘এত বড় একটি গণ-অভ্যুত্থান গেল, যার সঙ্গে জাতি হিসেবে আমাদের আত্মত্যাগ, অনেক স্বপ্ন জড়িত। তাহলে আমরা সবাই মিলে কেন একজন অরাজনৈতিক এবং গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করতে পারলাম না।’
তৃতীয় কারণকে নিজের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে রুমিন
ফারহানা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের আগে বিএনপি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের
ভয় দেখাল। অথচ ২০১৬ সাল থেকে বিএনপি ভিশন ২০৩০-এ গলার রগ ফুলিয়ে কথা বলছে।
এখন তারা বলছে, দলের বাইরে ভোট দিলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হবে। এ রকম
প্রহসনের ভোট আমি কেন দেব?’
তাদের মধ্যে মির্জা আব্বাস চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে থাকায় ভোটে অংশ নিতে পারেননি।
খেলাফত মজলিসের আবুল হাসানও বিদেশে থাকার কারণে ভোটদানে অংশ নিতে পারেননি দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ২০ জন কর্মকর্তা এমপিদের ভোটদানে সহায়তা ও ব্যালট পেপার সরবরাহ করেন। এমপিরা তিনটি স্বচ্ছ বাক্সে সাদা-কালো ছাপানো ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভোট দেন।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

