ডিজিটাল প্রলেতারিয়েত: নতুন যুগের নতুন লড়াই
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 04 Jul, 2026
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এবং ২০২৬ সালের পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের শাসনক্ষমতা ও মাঠের রাজনীতিতে ডানপন্থী ও রক্ষণশীল শক্তির এক নতুন মেরুকরণ দৃশ্যমান।
এই দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক ও পুঁজিবাদী ধারার রাজনীতির বিপরীতে একটি সমতাভিত্তিক, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বাম-প্রগতিশীল শক্তির (কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট, বিভিন্ন ছাত্র ও প্রগতিশীল পেশাজীবী সংগঠন) প্রাসঙ্গিকতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।
তবে, কেবল প্রথাগত অ্যানালগ ধারার রাজনীতি দিয়ে আজকের ডিজিটাল যুগের তরুণ প্রজন্ম ও আধুনিক অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দেওয়া অসম্ভব। প্রগতিশীল ধারাকে যদি একটি শক্তিশালী 'তৃতীয় বিকল্প' হিসেবে দাঁড়াতে হয়, তবে তত্ত্ব ও রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (AI) অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশে মুক্তবাজার অর্থনীতির চরম আগ্রাসন, তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, বাজার সিন্ডিকেট এবং বেকারত্বের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত।
আদর্শিক জায়গা থেকে বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোই একমাত্র ব্যবস্থা বদল ও জনগণের প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তির কথা বলে। কিন্তু ভোটের রাজনীতিতে এই আদর্শকে ব্যালটে রূপান্তর করা এবং তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রগতিশীল শিবিরের কিছু চিরন্তন সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যবহার না জানা এবং প্রথাগত প্রচারশৈলীর কারণে একটি বড় জনগোষ্ঠী এখনো প্রগতিশীল রাজনীতিকে 'অতীতমুখী' বা 'লাইব্রেরি-সর্বস্ব' মনে করে। এই ধারণা ভাঙা এখন সময়ের দাবি।
পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি এবং প্রগতিশীল শিবিরকে একটি আধুনিক ও যুগোপযোগী রূপ দিতে কৌশলগত পরিবর্তন আনা জরুরি:
ক) 'ডিজিটাল প্রলেতারিয়েত' বা নতুন মেহনতি শ্রেণির অধিকার আন্দোলন
শিল্পবিপ্লবের চিরায়ত 'কারখানার শ্রমিক' ধারণার বাইরে গিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের গিগ ইকোনমি (Gig Economy) ও আইটি খাতের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রগতিশীল আন্দোলনের মূল স্রোতে আনতে হবে।
অ্যাপ-ভিত্তিক কর্মীদের ইউনিয়ন: রাইড শেয়ারিং (পাঠাও, উবার) এবং ফুড ও পার্সেল ডেলিভারি (ফুডপ্যান্ডা, ই-কুরিয়ার ইত্যাদি) খাতের লাখ লাখ চালক ও কর্মী চরম শ্রম শোষণের শিকার। এদের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, চিকিৎসা ভাতা বা চাকরির নিরাপত্তা নেই। প্রগতিশীল দলগুলোকে এই 'ডিজিটাল প্রলেতারিয়েত' বা নতুন মেহনতি জনতার অধিকার আদায়ে অ্যাপ-ভিত্তিক আধুনিক ও ডিজিটাল ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে হবে।
ফ্রিল্যান্সার ও আইটি পেশাজীবী: ফ্রিল্যান্সিং এবং টেক স্টার্ট-আপগুলোতে কর্মরত তরুণদের কাজের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক পেমেন্ট গেটওয়ের জটিলতা এবং কর্পোরেট মানসিক চাপ নিয়ে কথা বলার মতো কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দেশে নেই। এই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত টেক-শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় প্রগতিশীল দলগুলোর সুনির্দিষ্ট আইটি বা প্রফেশনাল সেল থাকা প্রয়োজন।
খ) ডাটা-সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধ ও প্রযুক্তির গণতন্ত্রীকরণ
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনকে ব্যবহার করা হচ্ছে শ্রমিক ছাঁটাই এবং কর্পোরেটদের মুনাফা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে। বামপন্থীদের উচিত এর বিপরীতে একটি সমাজতান্ত্রিক ও মানবিক বয়ান (Narrative) তৈরি করা।
মানববান্ধব এআই: প্রযুক্তি মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নেবে না, বরং মানুষের কাজের সময় কমিয়ে তাকে আরও সৃজনশীল ও মানবিক করে তুলবে—এই বৈজ্ঞানিক ধারণাটি সমাজে ছড়িয়ে দিতে হবে। অটোমেশনের কারণে কেউ চাকরি হারালে তার বিকল্প কর্মসংস্থান বা 'টেক-বেকারত্ব ভাতা'র দাবি তুলতে হবে।
ডাটা বা তথ্যের সার্বভৌমত্ব: সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বা 'ডাটা' এখন বড় বড় টেক জায়ান্টদের প্রধান সম্পদ। এই ডাটা-মনোপলি বা তথ্য পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নাগরিকের 'ডিজিটাল রাইটস' বা তথ্যের অধিকার সুরক্ষায় নীতিগত আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
গ) এআই-চালিত রাজনৈতিক প্রচারণা ও আধুনিক যোগাযোগ (Propaganda & Communication)
আজকের তরুণ প্রজন্ম বই বা দীর্ঘ লিফলেট পড়ার চেয়ে ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট দেখতে বেশি পছন্দ করে। প্রগতিশীল ধারার প্রচারণাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও আকর্ষণীয় করতে হবে:
সিনেম্যাটিক ও ডিজিটাল কনটেন্ট: বামপন্থীদের ইশতেহার, নীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতিকে সহজ ভাষায় অ্যানিমেশন, ইনফোগ্রাফিক, শর্ট-ফিল্ম এবং পডকাস্টের মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। জটিল তাত্ত্বিক ভাষা পরিহার করে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় কনটেন্ট তৈরি করতে হবে।
এআই ও ডেটা অ্যানালিটিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়া ট্রেন্ড এবং জনআকাঙ্ক্ষা বিশ্লেষণ করতে হবে। এআই চালিত টুলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সমস্যাগুলো (যেমন: কোথাও নদীভাঙন, কোথাও তীব্র লোডশেডিং বা কৃষি সংকট) ডেটা অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ও কার্যকরী রাজনৈতিক কর্মসূচি ও রাজপথের আন্দোলন ডিজাইন করা সম্ভব।
ঘ) অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় ডিজিটাল গর্ভন্যান্স (Digital Governance)
দল ও জোটগুলোকে শক্তিশালী ও গতিশীল করতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনা পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন আনতে হবে:
ডিজিটাল মেম্বারশিপ ও ক্রাউডফান্ডিং: দলগুলোর সদস্যপদ ব্যবস্থাপনা, লেভি (চাঁদা) সংগ্রহ এবং সাধারণ প্রগতিশীল মানুষের কাছ থেকে ফান্ডের জন্য সুরক্ষিত মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব পোর্টাল চালু করা উচিত। এটি আর্থিক স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং তৃণমূলের সাথে কেন্দ্রের দূরত্ব দূর করবে।
অনলাইন প্রগতিশীল পলিটিক্যাল স্কুল: দর্শন, ইতিহাস, রাজনীতি এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্লাসগুলো কেবল দলীয় কার্যালয়ের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ না রেখে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS) ও অনলাইনের মাধ্যমে দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে, যা নতুন কর্মী তৈরিতে সাহায্য করবে।
কার্ল মার্ক্স বা প্রগতিশীল দর্শনের পুরোধারা কখনোই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিরোধী ছিলেন না, বরং তারা প্রযুক্তিকে মানুষের মুক্তির এবং উৎপাদন শক্তি বৃদ্ধির প্রধান নিয়ামক হিসেবে দেখেছিলেন। বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাম ও প্রগতিশীল ধারাকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা কেবল অতীতমুখী কোনো শক্তি নয়, বরং তারা বিজ্ঞানমনস্ক, আধুনিক এবং দূরদর্শী।
যদি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক দলগুলো তাদের প্রথাগত রাজনৈতিক কৌশলের সাথে এই বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটাতে পারে, তবেই তারা বুর্জোয়া ও ডানপন্থী দলগুলোর বিপরীতে দেশের তরুণ সমাজের কাছে একটি অগ্রগামী এবং শক্তিশালী 'তৃতীয় বিকল্প শক্তি' হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
প্রযুক্তিবিমুখ বামপন্থা শেষ পর্যন্ত কেবল লাইব্রেরির তাকেই শোভা পায়, রাজপথে নয়।
লেখক: হাসান ফেরদৌস, সাবেক সহসভাপতি, কেন্দ্রীয় সংসদ, সাবেক সভাপতি, চট্টগ্রাম জেলা, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন)
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

