‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ এনসিটি: কার হাতে যাচ্ছে অপারেশনাল কার্যক্রম?
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 16 Jun, 2026
চট্টগ্রাম বন্দরের হৃদপিণ্ড বলা চলে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি (NCT)-কে। বন্দরের চলমান চারটি টার্মিনালের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং রাজস্ব আসে এই টার্মিনালটি থেকে।
সম্প্রতি দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক বন্দর পরিচালক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড (DP World)-এর কাছে এই টার্মিনালটি দীর্ঘমেয়াদে ইজারা বা যৌথ ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সরকারি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও ধোঁয়াশা। দেশীয় অপারেটরদের আকর্ষণীয় বিকল্প প্রস্তাব, শ্রমিকদের ধারাবাহিক আন্দোলন, ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব আয়ের হিসাব-নিকাশ মিলিয়ে এনসিটি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি।
২০০৭ সালে নকশা করার সময় এনসিটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ধরা হয়েছিল ১১ লাখ টিইইউস (TEUs)। তবে বর্তমানে সম্পূর্ণ দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এটি নিজের সক্ষমতার চেয়েও বেশি সেবা দিচ্ছে। গত মে মাসে এনসিটিতে রেকর্ড ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা টার্মিনালটির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ। বর্তমানে বছরে প্রায় ১৩ লাখ ৩০ হাজার টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হচ্ছে এখানে, যা চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় অর্ধেক (প্রায় ৫০%)।
এনসিটি থেকে প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (CPA) সরাসরি এক হাজার কোটি টাকারও বেশি নিট রাজস্ব আয় করে। বন্দর সংশ্লিষ্ট অডিট অনুযায়ী, প্রতি একক (TEU) কনটেইনারে বর্তমানে হ্যান্ডলিং ও স্টোরেজ চার্জ মিলিয়ে মোট আয় হয় প্রায় ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। এর মধ্যে অপারেশনাল ও প্রশাসনিক ব্যয় মাত্র ৫৬ দশমিক ১৫ ডলার বাদ দিলে বন্দরের নিট লাভ থাকে ১০৫ দশমিক ৬৭ ডলার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড মূলত এনসিটির পাশাপাশি এখন এর লাগোয়া চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)-ও একসাথে পরিচালনা করতে চাচ্ছে। তারা ১৫ বছরের কনসেশনের (ইজারা) বিনিময়ে ২০ মিলিয়ন ডলার আপফ্রন্ট (অগ্রিম চুক্তি মূল্য) এবং প্রতি কনটেইনারে একটি নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই প্রস্তাবের বিপরীতে দুটি দেশীয় বড় গ্রুপ আরও আকর্ষণীয় এবং লাভজনক বিকল্প প্রস্তাব জমা দিয়েছে দেশীয় তিন কোম্পানির কনসোর্টিয়াম (সাইফ পাওয়ারটেক, কসমস ও এভারেস্ট)। এই জোট ১৫ বছরের জন্য শুধু 'অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স' এর প্রস্তাব দিয়েছে, কোনো ইজারা নয়।
* তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজেই সব মাশুল আদায় করবে।
* কনসোর্টিয়াম প্রতি একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বন্দরের কাছে ৬৯ ডলার ফি দাবি করেছে।
* এর ফলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল খরচ ছাড়াই বন্দর প্রতি কনটেইনারে প্রায় ৯২ ডলার নিট লাভ পাবে, যা বিদেশী কোম্পানির চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত আয়।
এমজিএইচ (MGH) গ্রুপের প্রস্তাব: দেশীয় এই বহুজাতিক লজিস্টিকস জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে প্রতি কনটেইনারে ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ার লিখিত গ্যারান্টি দিয়েছে।
* তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের ২০ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে ২৫ মিলিয়ন ডলার অগ্রিম ফি (Upfront Fee) দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।
* এমজিএইচ-এর দাবি, ১৫ বছরের এই মডেলে বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট আয় হবে প্রায় ১.৬৮ বিলিয়ন ডলার এবং সম্পূর্ণ টাকা দেশেই থাকবে, কোনো বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচার হবে না।
এনসিটি বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই বন্দরের সাধারণ শ্রমিক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, বার্থ অপারেটর এবং বিভিন্ন অংশীজন (Stakeholders) তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তরের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু হলে শ্রমিকদের টানা ৬ দিনের তীব্র আন্দোলনে বন্দরের পুরো কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন নৌপরিবহন উপদেষ্টা এসেও শ্রমিকদের শান্ত করতে বেগ পান। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীদের চাপে সরকার প্রক্রিয়াটি সাময়িক স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
বর্তমানে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে কেনা ১৪টি আধুনিক কি-গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ব্যাকআপ ইয়ার্ড সমৃদ্ধ এই টার্মিনালটি বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (CDDL) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পরিচালনা করছে। যেখানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় তদারকিতে লাভজনকভাবে বন্দর চলছে, সেখানে তৈরি করা সম্পদ বিদেশীদের ইজারা দেওয়া আত্মঘাতী।
ভূ-রাজনৈতিক ও সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি
শিপিং এবং স্ট্র্যাটেজিক বিশেষজ্ঞরা এনসিটি এবং সিসিটি একক কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখছেন। এনসিটি (১৫ লাখ টিইইউস) এবং সিসিটি (৭ লাখ টিইইউস) মিলে মোট ২২ লাখ টিইইউস হ্যান্ডলিং ক্ষমতা। এটি কোনো একটি বিদেশী অপারেটরের হাতে গেলে দেশের মোট কনটেইনার বাণিজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ একক নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি বিদেশী রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রতিষ্ঠানের সাথে পশ্চিম ও আঞ্চলিক কিছু দেশের গভীর লবিংয়ের সম্পর্ক রয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান ডিফেন্স বা সামরিক স্থাপনার গা ঘেঁষে অবস্থিত এই টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ বিদেশী শক্তির হাতে গেলে তা জাতীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাছাড়া, বিদেশী কোম্পানি লাভ বা রেভিনিউ নিজ দেশে নিয়ে যাবে (Profit Repatriation), যা দেশের ডলার সংকটের এই সময়ে রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
দেশের 'সোনার ডিম পাড়া হাঁস' এনসিটিকে বাঁচানো এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্ধভাবে বিদেশী কোম্পানিকে পুরো টার্মিনাল ইজারা না দিয়ে, বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব মালিকানা বজায় রেখে দেশীয় সক্ষমতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই যেন সিসিটি বা এনসিটির নিয়ন্ত্রণ এমন কোনো চুক্তি বা শর্তে না যায়, যা বাংলাদেশের নিজস্ব বন্দর ব্যবস্থাপনাকে পঙ্গু করে দেয়।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

