:

শতবর্ষের মহাবিস্ময়: টুঙ্গিপাড়ার 'খোকা' থেকে বিশ্বরাজনীতির 'হিমালয়'

top-news

আজ ১৭ই মার্চ। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী।

১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার এক নিভৃত পল্লীতে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, কালক্রমে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন পরাধীন বাঙালি জাতির মুক্তির দিশারি। আজ জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছে সেই মহানায়ককে, যাঁর হাত ধরে বিশ্বমানচিত্রে উদিত হয়েছিল 'বাংলাদেশ' নামক এক স্বাধীন রাষ্ট্র। 

শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের কোল আলো করে আসা ‘খোকা’ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন পরোপকারী। তাঁর মানবিকতার উদাহরণ পাওয়া যায় তাঁর লেখনী 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী'-তে। সেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে দুর্ভিক্ষের সময় নিজের গোলার ধান বিলিয়ে দিয়েছিলেন অভাবীদের মাঝে। ১৯৪২ সালে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হওয়া ছিল তাঁর রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে তিনি হয়ে ওঠেন এক নির্ভীক সংগঠক।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ছিল ত্যাগ ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ মহাকাব্য। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ৬৬-র ঐতিহাসিক ৬-দফা—প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

৬-দফা ও স্বায়ত্তশাসন:  ১৯৬৬ সালে লাহোরে তিনি যে ৬-দফা পেশ করেন, তা ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দলিল। পাকিস্তান সরকার তাঁকে স্তব্ধ করতে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দেয়, কিন্তু ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান তাঁকে বীরের বেশে মুক্ত করে আনে।
৭ই মার্চের অমর কবিতা:  ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ১৮ মিনিটের সেই ভাষণ ছিল মূলত এক অলিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা। আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'নিউজউইক' তাঁকে আখ্যা দেয় 'Poet of Politics' বা রাজনীতির কবি হিসেবে। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো একে 'বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রায় ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। তাঁর এই বন্দি জীবনের নিদারুণ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দর্শন ফুটে উঠেছে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ 'কারাগারের রোজনামচা'-তে। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেও তিনি বাংলার মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন। তিনি লিখেছিলেন, "মানুষ যখন একা থাকে তখন পশুপাখিও তার বন্ধু হয়।" তাঁর এই অদম্য মনোবলই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির প্রধান প্রেরণা ছিল।

বঙ্গবন্ধুর বিশালত্ব কেবল বাংলাদেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর উচ্চতা ছিল আকাশচুম্বী।

ফিদেল কাস্ত্রো (১৯৭৩): "আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়।"
যশোদারা বাগচী: ভারতীয় এই ইতিহাসবিদের মতে, "মুজিব ছিলেন আধুনিক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী নেতা।"


বিবিসি জরিপ (২০০৪): সহস্রাব্দের জনমত জরিপে বঙ্গবন্ধুকে 'সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি' হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান:

জাতিসংঘে ভাষণ (১৯৭৪): ২৫শে সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষাকে অনন্য মর্যাদা দেন। 
মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তন: ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ ভারতীয় সেনাদের সসম্মানে ফেরত পাঠান, যা বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। |
ওআইসি (OIC) সদস্যপদ: ১৯৭৪ সালে লাহোরে ইসলামিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে মুসলিম বিশ্বের সাথে বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটান। |
মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি: ১৯৭৪ সালে ভারতের সাথে সীমান্ত সমস্যার সমাধানে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। 
জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন:  ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম (NAM) সম্মেলনে শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশ্বনেতাদের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। 

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। মাত্র ১০ মাসে তিনি একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকদের নির্মম বুলেটে সপরিবারে শহীদ হন এই মহান নেতা। এটি ছিল বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন ছিল ত্যাগ ও সংগ্রামের এক দীর্ঘ মহাকাব্য। ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ৬৬-র ঐতিহাসিক ৬-দফা—প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি প্রমাণ করেছেন তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

৬-দফা ও স্বায়ত্তশাসন: ১৯৬৬ সালে লাহোরে তিনি যে ৬-দফা পেশ করেন, তা ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির দলিল। পাকিস্তান সরকার তাঁকে স্তব্ধ করতে 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' দেয়, কিন্তু ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান তাঁকে বীরের বেশে মুক্ত করে আনে।

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি শূন্য হাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ফিরেছিলেন তিনি। মাত্র সাড়ে তিন বছরে তিনি যা করেছেন, তা সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল:  মাত্র ১০ মাসে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রদান।  ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সদস্যদের তিন মাসের মধ্যে স্বদেশে ফেরত পাঠানো (যা বিশ্বের সামরিক ইতিহাসে বিরল)। জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় ভাষণ প্রদান (১৯৭৪) এবং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পরিচিতি লাভ।  প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ এবং কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন।

৭ই মার্চের অমর কবিতা: ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানের ১৮ মিনিটের সেই ভাষণ ছিল মূলত এক অলিখিত স্বাধীনতার ঘোষণা। আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'নিউজউইক' তাঁকে আখ্যা দেয় 'Poet of Politics' বা রাজনীতির কবি হিসেবে। ২০১৭ সালে ইউনেস্কো একে 'বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।  ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পরিণত হয়েছিল এক জনসমুদ্রে। ১০ লক্ষাধিক মানুষের সামনে বঙ্গবন্ধু যখন শাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোট পরে ডায়াসে দাঁড়ালেন, তখন পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল একজন নেতার সম্মোহনী শক্তি।

বঙ্গবন্ধুর দেওয়া এই পররাষ্ট্রনীতি আজও বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। তাঁর কূটনৈতিক দূরদর্শিতার কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ৭ই মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠ আর ১৯৭৪-এর জাতিসংঘে বাংলায় দেওয়া সেই ভাষণ—সবই ছিল এক সূত্রে গাঁথা, যা হলো বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন আন্তর্জাতিক মানের দূরদর্শী কূটনীতিক। শূন্য থেকে শুরু করে মাত্র সাড়ে তিন বছরে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। 

জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি :১৯৭৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে। ২৫শে সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু প্রথম নেতা হিসেবে সেখানে বাংলায় ভাষণ দেন।

মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তন : ১৯৭২ সালের ১২ই মার্চ ভারতীয় সেনাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো। বিশ্বের ইতিহাসে কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে এত দ্রুত বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার বিরল।

ওআইসি সদস্যপদ: ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (OIC) শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়ে মুসলিম বিশ্বের সাথে বৈরী সম্পর্কের অবসান ঘটান।

সিমলা চুক্তিতে ভূমিকা    ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কের টানাপোড়েনের মাঝেও বাংলাদেশ নিজের সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন:১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে ন্যাম (NAM) সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শোষিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশ্বনেতাদের নজরে আসেন।

স্বীকৃতি অর্জন: ১৯৭৫ সালের আগস্টের মধ্যে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ (১৩০টিরও বেশি) বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

সীমানা চুক্তি:  ১৯৭৪ সালে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক 'মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি' স্বাক্ষর, যার মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথ সুগম হয়।

বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তাঁর মৃত্যু হলেও তাঁর আদর্শ অবিনশ্বর। আজ তাঁর ১০৬তম জন্মবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *