জ্বালানী তেল সংকট: বন্ধ হচ্ছে ফিলিং ষ্টেশন, তেলর জন্য লম্বা লাইন
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 07 Mar, 2026
বাংলাদেশে অপরিশোধিত-পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির বড় উৎস বা বাজার মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষত সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত থেকে জ্বালানি তেল কেনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সেই সঙ্গে কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া এলপিজির প্রধান উৎসদেশও মধ্যপ্রাচ্যে। এ তিন ধরনের জ্বালানি বাংলাদেশে জলপথে আমদানি করতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করা হয়। আমদানিনির্ভর জ্বালানিতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ওপর নির্ভরশীল।
যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি ও আঞ্চলিক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আর তেমনটা হলে এ অঞ্চলের সমুদ্রপথে জ্বালানি পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সে রকমটা ঘটলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় সংকট তৈরি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে শিল্প উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর মধ্যে সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড অয়েল থেকে জ্বালানি তেল কেনে বিপিসি। দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় হুমকি তৈরির আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি বিপিসির কর্মকর্তারা। যদিও জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদ ও সরবরাহে সাময়িক কোনো সমস্যা দেখছে না বিপিসি।
দেশের জ্বালানি চাহিদার ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এর বেশির ভাগ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। এসব পণ্যের বড় অংশ আমদানি হয় মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশ কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান থেকে। বিশেষ করে দেশে এলএনজি ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের একক সরবরাহ উৎস কাতার, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তা বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনাসহ আর্থিক খাতে বড় সংকট তৈরি করতে পারে বলে জানিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌ মিশন অ্যাসপিডসের একজন কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ইরানের বিপ্লবী গার্ডদের কাছ থেকে জাহাজগুলো ভিএইচএফ ট্রান্সমিশন (রেডিও বার্তা) পাচ্ছে যে কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে দেয়া হবে না। তবে এ কর্মকর্তা রয়টার্সকে এটাও বলেছেন যে ইরান সরকারের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এমন কোনো নির্দেশ জারি করা হয়নি। উল্লেখ্য, এ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি পথ, যা উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে।
দেশে প্রতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আসে মধ্যপ্রাচ্যের দুই দেশ থেকে। এছাড়া এলএনজির ৫৫ শতাংশ আসে কাতার ও ওমান থেকে। আর এলপিজি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার প্রায় পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক।
ইরানের বিভিন্ন শহরে গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র একযোগে আঘাত হেনেছে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, সৌদি আরব ও বাহরাইনে। এ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশ আকাশপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ইরান যদি আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ৯৫ থেকে ১১০ ডলারে উঠে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় যদি যুদ্ধ অব্যাহত থাকে, তাহলে তেলের দাম বেড়ে যাবে। এ ঘটনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। আর তা দেশে গুরুতর গ্যাস সংকট সৃষ্টি করতে পারে।’
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি কেনে বাংলাদেশ। প্রতি বছর যে পরিমাণ এলএনজি কার্গো দেশে আসে তার প্রায় ৪০ শতাংশ আমদানি হয় কাতার থেকে। ১৫ বছর মেয়াদি এ এলএনজি চুক্তির বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ১ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন থেকে আড়াই মিলিয়ন টন পর্যন্ত। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতিতে দেশে গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে সংঘাত আরো বেড়ে গেলে আমদানিতে ব্যবহৃত সমুদ্রপথ অনিরাপদ বা বন্ধ হয়ে গেলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে সে বিষয়ে তাৎক্ষণিক কিছু জানাতে চাননি পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হয়েছে। কাতার থেকে আমরা এলএনজি আমদানি করি। যে পথ দিয়ে এলএনজি আসে, সেই পথ বন্ধ হয়ে গেলে তা আমাদের জন্য দুশ্চিন্তা বাড়াবে। পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে আমরা সার্বক্ষণিক তার ওপর নজর রাখছি। সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি নজরে রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
গতকাল কাতারের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ছোড়া মিসাইল আঘাত হানে। সতর্কতামূলক পদক্ষেপে কাতার আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। সেই সঙ্গে পণ্য পরিবহনকারী জাহাজ চলাচলও সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করেছে বলে দ্য পেনিনসুলার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের বড় ব্যবহার রয়েছে। প্রয়োজনীয় গ্যাস আমদানির বড় উৎস কাতার। গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় কোনো সংকট তৈরি হলে আসন্ন গ্রীষ্ম মৌসুমে লোডশেডিং বেড়ে যেতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এর মধ্যে সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল (এএলসি) ও আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড অয়েল থেকে জ্বালানি তেল কেনে বিপিসি। দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল আমদানি করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি হলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় হুমকি তৈরির আশঙ্কা উড়িয়ে দেননি বিপিসির কর্মকর্তারা। যদিও জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদ ও সরবরাহে সাময়িক কোনো সমস্যা দেখছে না বিপিসি।
মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান বলেন, ‘পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আগামী জুন পর্যন্ত কোনো সমস্যা নেই। এক্ষেত্রে আমরা আপাতত সেফ সাইডে (নিরাপদ অবস্থায়) রয়েছি। পরিশোধিত জ্বালানি তেল মালয়েশিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আসছে। এসব দেশ থেকে জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
তবে অপরিশোধিত বা ক্রুড অয়েলের দীর্ঘমেয়াদি উৎস সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত হওয়ায় চলমান সংঘাত কী প্রভাব রাখতে পারে জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘ক্রুড অয়েলের বিষয়টি (পণ্য পরিবহন) আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। এটুকু বলা যায় যে এ মুহূর্তে আমাদের জ্বালানি তেলের রিজার্ভে কোনো সংকট নেই।’
মধ্যপ্রাচ্যে ও উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, বরং পরিশোধিত তেলও আমদানি হয়। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা কেপিসি, ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড এবং আরব আমিরাতের এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের (ইনক) কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ পরিশোধিত তেল কেনে বাংলাদেশ।
দেশের বাজারে প্রতি বছর অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন হয়। দেশের বাজারে এ গ্যাসের সরবরাহ পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষত সৌদি আরবসহ ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশ থেকে পণ্যটি আমদানি করে দেশের বাজারে সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বাজারে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এলপি গ্যাসের সংকট চলছে। এ পরিস্থিতিতে সংঘাত বিস্তৃত হলে তা দেশের এলপি গ্যাসের বাজারে সংকট আরো তীব্র করতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শিল্প উদ্যোক্তা ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে গ্যাস, এলপিজি, ক্রুড অয়েল আসে বাংলাদেশে। এটা আমাদের জ্বালানির বড় উৎস অঞ্চল। এ অঞ্চলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানির বড় অংশ পরিবহন হয়। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশে সাপ্লাই চেইন বড় ধরনের সংকটে পড়বে। সেই সঙ্গে জ্বালানি পণ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। সরকারকে বিষয়গুলো মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশেষ করে এ অঞ্চলে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে অগ্রিম যোগাযোগও রাখা যেতে পারে।’
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, দেশের জ্বালানি খাতে তার প্রভাবসহ সার্বিক বিষয় পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কীভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা ভালো কিছু নয়। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং সার্বিক বিষয় নিয়ে মিটিং কল করা হয়েছে। বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে যেন কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে আমদানির পরিকল্পনা নিয়েও ভাবা হচ্ছে।’
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

