:

ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘হামলা’: মাদুরোকে আটকের দাবি ট্রাম্পের

top-news

বিশ্বের অন্যতম তেল সমৃদ্ধ ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসসহ একাধিক রাজ্যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টারের মহড়ার খবর পাওয়া গেছে। ভেনিজুয়েলার সরকার অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বেসামরিক ও সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় ‘বড় ধরনের হামলা’ চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে।

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে মার্কিন সেনাবাহিনীর বিশেষ কাউন্টার-টেরোরিজম ইউনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’ আটক করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বিবিসির সহযোগী সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ এ তথ্য জানিয়েছে। তবে মাদুরোকে কীভাবে আটক করা হয়েছে বা বর্তমানে কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

৫০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ও মাদক পাচারের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্র পরিচালনার অভিযোগ করে আসছে, যা মাদুরো সবসময় অস্বীকার করেছেন। মাদুরোকে গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৫০ মিলিয়ন ডলার (৫ কোটি ডলার) পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক মাসে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং এই বিপুল অঙ্কের পুরস্কার মূলত মাদুরোর বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ কাউকে উসকে দেওয়ার কৌশল ছিল

অর্ন্তজাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, ৩ জানুয়ারী ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। শহরের কৌশলগত এলাকাগুলো থেকে ধোঁয়ার কুন্ডলী উঠতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের সময় মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টারগুলো কারাকাসের ওপর দিয়ে খুব নিচু হয়ে উড়ছিল। বিস্ফোরণের ফলে রাজধানীর দক্ষিণের এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ভেনিজুয়েলার সরকারের ভাষ্যমতে, শুধু কারাকাস নয়, মিরান্ডা, আরাগুয়া এবং লা গুয়াইরা রাজ্যেও হামলা চালানো হয়েছে। ফক্স নিউজের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করেছে। তবে ওয়াশিংটন থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃংখলা বাহিনীর সহায়তায় ভেনেজুয়েলায় একটি বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি জানান, এই অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

জরুরি অবস্থা জারি কথা জানিয়ে এই ঘটনাকে ‘চরম সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ভেনিজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো দেশজুড়ে ‘স্টেট অফ এক্সটারনাল ডিস্টার্বেন্স’ বা জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আর্ন্তজাতিক প্রতিক্রিয়া:  
ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের কথিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কিউবা ও কলম্বিয়া। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল একে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ এবং লাতিন আমেরিকার ওপর হামলা বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো একতরফা সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, এটি সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

তবে, এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো, যিনি এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছিলেন, তাঁর বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।

প্রেসিডেন্ট মাদুরো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের রিজার্ভের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র করছে।

ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘ এবং আমেরিকান স্টেটস অর্গানাইজেশনে (ওএএস) জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে হামলার পরপরই এক জরুরি বার্তায় এই আহ্বান জানান তিনি। খবর এল ন্যাশিওনাল।

হামলার প্রতিবাদে সমর্থকদের রাজপথে নামার ডাক মাদুরোর
রাজধানী কারাকাসে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ভেনিজুয়েলার সরকার তাদের সমর্থকদের রাজপথে নেমে আসার জরুরি আহ্বান জানিয়েছে। এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “জনগণ রাস্তায় নেমে আসুন! বলিভারিয়ান সরকার দেশের সমস্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং এই সাম্রাজ্যবাদী হামলার সমুচিত জবাব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।”

‘মাদুরো নতি স্বীকার না করা পর্যন্ত হামলা চলবে’ ৩ জানুয়ারী বিমান হামলা এবং কারাকাসে বিস্ফোরণের ঘটনা নতুন করে এই জল্পনা উস্কে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে। গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে ভ্যানিটি ফেয়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প প্রশাসনের এমন মনোভাবের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।

সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিফ অফ স্টাফ সুসি ওয়াাইলস মন্তব্য করেছিলেন , তাঁর বস (ট্রাম্প) “ততক্ষণ পর্যন্ত বোট উড়িয়ে দিতে চান, যতক্ষণ না মাদুরো নতি স্বীকার করেন বা দয়া ভিক্ষা করেন। মূলত ক্যারিবিয়ান সাগরে ভেনিজুয়েলার কথিত মাদকবাহী বোটগুলোর ওপর টানা মার্কিন হামলার প্রসঙ্গ টেনেই তিনি এ কথা বলেছিলেন।

এরআগে বৃস্পতিবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো জানিয়েছিলেন যে, তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে মাদক চোরাচালান এবং দেশের তেলের রিজার্ভ নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে তিনি এও পুনর্ব্যক্ত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো ভেনেজুয়েলায় সরকার পরিবর্তন ঘটানো এবং দেশটির বিশাল তেলের ভান্ডার দখল নেওয়া।

বোস্টন ইউনিভার্সিটির ল্যাটিন আমেরিকান স্টাডিজের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও সাবেক বিট্রিশ কূটনীতিক পল হেয়ারের মতে, শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসনের হয়তো মাদুরোকে সরানোর তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা ছিল না। তিনি বলেন, “ধারণা ছিল মাদুরোর সাথে অভিবাসন বা তেলের সুবিধা নিয়ে কোনো একটি ব্যবসায়িক চুক্তি করা, যাতে তিনি ক্ষমতায় থাকতে পারেন। কিন্তু সুসি ওয়াইলসের সাক্ষাৎকার এবং সাম্প্রতিক হামলাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং মাদুরো এখন সরাসরি ট্রাম্পের অভিযানের মূল লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছেন।”

হতাহতের তদন্ত ও প্রতিরোধের ঘোষণা এদিকে ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির প্যাদ্রিনো জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালের হামলায় হতাহতদের বিষয়ে সরকার তথ্য সংগ্রহ করছে। তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন হামলায় বেসামরিক এলাকাগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে করা হয়েছে। প্যাদ্রিনো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ভেনেজুয়েলা যেকোনো বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতির বিরুদ্ধে ‘প্রতিরোধ’ গড়ে তুলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *