বাংলাদেশকে কি বার্তা দিতে চায় রাশিয়া
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 29 Dec, 2025
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন এক গভীর সন্ধিক্ষণে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের চাপ, অন্যদিকে ভারত ও রাশিয়ার ঐতিহাসিক অক্ষের সতর্কতা এই দ্বিমুখী স্রোতে দুলছে ঢাকার কূটনীতি। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রদূতের ‘ইউক্রেন পরিস্থিতি’ স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশে থাকার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে পরাশক্তিগুলোর এই স্নায়ুযুদ্ধ বাংলাদেশকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লষণ।
গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকায় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার মান্টিটস্কি (বা আলেকজান্ডার খোজিন) যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কূটনৈতিক এক কঠোর বার্তা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লষকরা। রুশ রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা সম্ভব নয় এবং ভারতের সাথে উত্তেজনা জিইয়ে রাখা বাংলাদেশের জন্য শুভ হবে না।
সবচেয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে তাঁর ‘ইউক্রেন’ প্রসঙ্গ টানা। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যেমন পশ্চিমাদের প্ররোচনায় রাশিয়ার ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছে, রুশ রাষ্ট্রদূত পরোক্ষভাবে বাংলাদেশকেও একই ইঙ্গিত দিচ্ছেন কিনা এই নিয়েও আলোচনার ঝড় বইছে। যুক্তরাষ্ট্রের কথায় এই অঞ্চলে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বা কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট হলে রাশিয়া চুপ থাকবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের পালাবদলের পর (৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী) ভারতের সাথে সম্পর্কের যে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বুঝা যাচ্ছে, দিল্লির পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে মস্কো। ভারত মনে করে, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাড়লে তা ভারতের সেভেন সিস্টার্স এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তাদের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে পাশে পেতে। বঙ্গোপসাগরে চীনের প্রভাব কমানো এবং এই অঞ্চলে সামরিক ও বাণিজ্যিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনের কাছে ঢাকার গুরুত্ব অপরিসীম। নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আগমন এবং বিভিন্ন মার্কিন প্রতিনিধি দলের সফর সেই আগ্রহেরই বহিঃপ্রকাশ।
ভূ-রাজনৈতিক এই টানাটানিতে বাংলাদেশের অভ্যান্তরীন রাজনীতি, বিশেষ করে ‘মৌলবাদ’ ইস্যুটি তরুপের তাস হয়ে উঠেছে। ভারত ও রাশিয়া মনে করে, বর্তমান অর্ন্তবর্তী সরকার যদি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিতে পারে।
আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, “রাশিয়া ও ভারত বোঝাতে চাইছে, তাদের সহযোগিতা ছাড়া বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন। আর স্থিতিশীলতা না থাকলে বাংলাদেশ উগ্রবাদের উর্বর ভূমিতে পরিণত হতে পারে, যা কারো জন্যই কাম্য নয়।”
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই মূলত পরাশক্তিগুলোর এই দৌড়ঝাঁপ।
বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, রাশিয়া ও ভারত চায় এমন একটি সরকার, যারা ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্বার্থ (যেমন রূপপুর প্রকল্প) রক্ষা করবে।
যুক্তরাষ্ট্র: চায় একটি পশ্চিমাপন্থী সরকার, যারা চীনের প্রভাব মুক্ত থাকবে এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ধুয়া তুলে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে।
চীন: আপাতত ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিতে আছে। ভারত ও আমেরিকার দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ যেন পুরোপুরি হাতছাড়া না হয়, সেদিকেই বেইজিংয়ের নজর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, “বাংলাদেশের সামনে এখন ‘ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট’ বা ভারসাম্য রক্ষা ছাড়া কোনো পথ নেই। বাংলাদেশ যদি রাশিয়ার পরামর্শ উপেক্ষা করে পুরোপুরি আমেরিকার দিকে ঝুঁকে তাতে ভারত সীমান্তে অসহযোগিতা শুরু করতে পারে এবং রাশিয়া আর্ন্তজার্তিক অঙ্গনে সমর্থন তুলে নিতে পারে। আবার আমেরিকাকে চটালে বাংলাদেশর প্রধান রপ্তানি খাত (গার্মেন্টস) ও জিএসপি সুবিধা হুমকিতে পড়বে।”
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, “রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ইউক্রেন পরিস্থিতির উল্লেখ করা মানেই হলো, এখানে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা অস্থিতিশীলতা তৈরির সক্ষমতা তাদের আছে। সরকারের উচিত জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যাতে বাংলাদেশ পরাশক্তিগুলোর প্রোক্সি যুদ্ধের মাঠে পরিণত না হয়।”
তারা আরো বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সরু দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার মতো। রাশিয়ার খোলাখুলি অবস্থান এবং আমেরিকার কৌশলগত চাপের মাঝে বাংলাদেশকে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখা এখন জরুরী। আবেগের বশবর্তী হয়ে কোনো একটি ব্লকে যোগ দিলে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে এই কূটনৈতিক ঝড় সামলানোই হবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

