:

পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় বাংলাদেশী যবুকদের জঙ্গী সংগঠনে ভেড়ানোর অভিযোগ

top-news

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে, ঠিক তখনই পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম **Dawn (ডন)** বাংলাদেশ নিয়ে দুটি পৃথক ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ডন-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে একদিকে যেমন বাংলাদেশি তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনে ভেড়ানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বরাতে ডন-এর এই প্রতিবেদন দুটিতে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

দুবাইয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে পাকিস্তানের জঙ্গি ক্যাম্পে
ডন-এর নিরাপত্তা বিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর তথ্য। পাকিস্তানের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন **তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP)**-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে বাংলাদেশি তরুণদের যোগদানের নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি সরাসরি কোনো মতাদর্শিক যোগদান নয়, বরং এর পেছনে কাজ করছে মানবপাচার ও প্রতারণার এক বিশাল সিন্ডিকেট।

ফয়সালের করুণ পরিণতি:

প্রতিবেদনে মাদারীপুরের ২২ বছর বয়সী তরুণ **ফয়সাল হোসাইন**-এর উদাহরণ টানা হয়েছে। পরিবারের কাছে তিনি বলেছিলেন দুবাইয়ে চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু দালালচক্র তাকে দুবাইয়ের বদলে ভারতে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে সীমান্ত পার করে পাকিস্তানে পাঠায়। ডন জানায়, গত ২৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন ফয়সাল। পরিবারের সদস্যরা জানতেনই না যে তাদের সন্তান জঙ্গিগোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছেন।

প্রতারণার কৌশল:
ডন-এর তদন্তে দেখা গেছে, দালালচক্র নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার তরুণদের টার্গেট করছে।
* প্রথমে বলা হয় সৌদি আরব বা দুবাইয়ে উচ্চবেতনের চাকরি দেওয়া হবে।
* এরপর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ভারতের ভিসা।
* ভারত হয়ে অবৈধভাবে পাকিস্তানে ঢুকিয়ে তাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
এছাড়া ঝুবায়ের আহমেদএবং রতন ঢালী নামে আরও দুই বাংলাদেশি তরুণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা একইভাবে প্রতারিত হয়ে পাকিস্তানে গিয়ে জঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ডন-কে জানিয়েছেন, এই প্রবণতা বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান—তিনটি দেশের জন্যই এক নতুন ক্রস-বর্ডার সন্ত্রাসবাদ হুমকি’ তৈরি করেছে।

 রাজনীতি ও অর্থনীতি: অনিশ্চয়তার কালো মেঘ

জঙ্গিবাদের উদ্বেগের পাশাপাশি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও একটি বিশদ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে ডন। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশ চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে লড়াই করছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:
প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সাবেক সরকারপ্রধানের দেশে ফেরার গুঞ্জন, গণভোটের সম্ভাবনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জোট গঠন নিয়ে ধোঁয়াশা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতি স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক হাহাকার ও বেকারত্ব:

ডন-এর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সাধারণ মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:
মূল্যস্ফীতি: সবজি, মাংস, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
কর্মসংস্থান সংকট: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে প্রায় ২.৭৩ মিলিয়ন (২৭ লাখ ৩০ হাজার) মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেক শিল্পকারখানা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে।

এতসব নেতিবাচক খবরের মধ্যেও ডন বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরেছে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কন্টেইনার টার্মিনাল’ এবং বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বে টার্মিনাল মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার প্রজেক্ট’-এর মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ডন-এর প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই উন্নয়নগুলো টেকসই করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়:

১. নিরাপত্তা জোরদার: মানবপাচার চক্র ও ভুয়া চাকরির প্রলোভন রোধে সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও কঠোর অভিযান চালাতে হবে।
২. রাজনৈতিক সুশাসন: বিনিয়োগ ধরে রাখতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে রাজনৈতিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

ডন-এর প্রতিবেদন দুটির সারমর্ম হলো—বাংলাদেশ বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের থাবা থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করা এবং অন্যদিকে অর্থনীতিকে সচল রাখা—এই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *