:

২০ ডিসেম্বর থেকে বাড়ছে রেলের ভাড়া

top-news

২০ ডিসেম্বর থেকে সব যাত্রীবাহী ট্রেনের ভাড়া বাড়াচ্ছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল কর্তৃপক্ষ। এতে সর্বোচ্চ ভাড়া বাড়ছে ২০০ টাকারও বেশি। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর গতকাল পূর্বাঞ্চল রেলের বাণিজ্যিক বিভাগ থেকে নতুন ভাড়া কার্যকরের বিষয়টি অনুমোদিত হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর থেকে টিকিট ক্রয়ে বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে যাত্রীদের। বাংলাদেশ রেলওয়ের সাম্প্রতিক ভাড়া বৃদ্ধির  ঘোষণাটি দেশের যাত্রী সাধারণের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে 'এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ চার্জ' আরোপের মাধ্যমে এই ভাড়া বৃদ্ধি করা হচ্ছে। যদিও রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে ভাড়া না বাড়ার কারণে পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় করতেই এই পদক্ষেপ। তবে এই বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর যে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে, তা অনস্বীকার্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ট্রেন ভাড়া বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের জন্য, এক নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে।

বর্ধিত ভাড়া ও রুটের পরিবর্তন
রেলওয়ের এই ভাড়া বৃদ্ধি মূলত পন্টেজ চার্জ (Pontege Charge) আরোপের কারণে, যা ১০০ মিটার বা তার চেয়ে দীর্ঘ সেতু ও কালভার্টকে কেন্দ্র করে ধার্য করা হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলে এই প্রথম ১১টি সেতুতে পন্টেজ চার্জ যুক্ত হচ্ছে।
১. চট্টগ্রাম-জামালপুর-চট্টগ্রাম (ভায়া: ভৈরববাজার-ময়মনসিংহ) রুট

দূরত্ব বৃদ্ধি: ৪৪৭ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ৪৬৪ কিলোমিটার (বৃদ্ধি: ১৭ কিলোমিটার)।

শ্রেণিভিত্তিক বর্ধিত ভাড়া:

মেইল-কমিউটার: ১০ টাকা
শোভন চেয়ার: ২০ টাকা
প্রথম সিট: ২৯ টাকা
 স্নিগ্ধা: ৩৪ টাকা
 প্রথম বার্থ ও এসি সিট: ৪৬ টাকা
  এসি বার্থ: ৬৯ টাকা

২. ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ-ঢাকা রুট
দূরত্ব বৃদ্ধি: ২১২ কিলোমিটার থেকে বেড়ে ২১৬ কিলোমিটার (বৃদ্ধি: ৪ কিলোমিটার)।

শ্রেণিভিত্তিক বর্ধিত ভাড়া:

মেইল ট্রেনে: কোনো ভাড়া বৃদ্ধি নেই।
 কমিউটার ট্রেন, শোভন চেয়ার ও প্রথম সিট: ৫ টাকা করে
  স্নিগ্ধা: ১১ টাকা
  প্রথম বার্থ ও এসি সিট: ১২ টাকা
 এসি বার্থ: ১৭ টাকা

৩. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রুটে ভাড়া বৃদ্ধি
 ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের আন্তঃনগর ট্রেনের ভাড়া সর্বনিম্ন ১৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের মতে, ঢাকা-চট্টগ্রামের সর্বনিম্ন ভাড়া বাড়ছে মাত্র ১৫ টাকা, যা সাধারণ যাত্রীদের জন্য কম চাপ সৃষ্টি করবে।

এই নতুন ভাড়ার হার বেসরকারি টিকিট বিক্রয় ব্যবস্থাপক 'সহজ' (জেভি)-কে জানানো হয়েছে এবং ১০ ডিসেম্বর থেকে অগ্রিম টিকিটে এটি কার্যকর হবে।

সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ

ট্রেন বাংলাদেশের সাধারণ এবং মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ গণপরিবহন। ভাড়ার সামান্য বৃদ্ধিও লক্ষাধিক নিয়মিত যাত্রীর ওপর সরাসরি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।

    দৈনন্দিন যাত্রীদের ক্ষতি: যারা নিয়মিত কাজের তাগিদে বা ব্যবসায়িক কারণে ট্রেনে যাতায়াত করেন, তাদের মাসিক যাতায়াত খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। প্রতি মাসে যদি একজন যাত্রী ২০ বার শোভন চেয়ারে যাতায়াত করেন (চট্টগ্রাম-জামালপুর রুটে), তবে তার অতিরিক্ত খরচ হবে  ৪০০টাকা।

অর্থনৈতিক দুর্বলতা: মূল্যস্ফীতির এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী। এর মধ্যে ট্রেন ভাড়া বৃদ্ধি পেলে তা স্বল্প আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে, যা সঞ্চয়কে সংকুচিত করবে।

অন্যান্য খাতে প্রভাব: ট্রেন ভাড়া বৃদ্ধির ফলে অনেক যাত্রী বাসে বা অন্যান্য পরিবহনে স্থানান্তরিত হতে পারে, যা সড়ক পথে অতিরিক্ত ভিড় ও চাপ তৈরি করতে পারে।

 গত এক দশকে বাংলাদেশে ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি 

বাংলাদেশ রেলওয়েতে সাধারণত বেশ দীর্ঘ বিরতিতে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়। গত এক দশকে (২০১৫-২০২৫) রেলের ভাড়া বৃদ্ধির প্রধান দুটি উল্লেখযোগ্য সময় হলো:

 ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি: এই সময়ে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। গড়ে ৭.৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়।

সাম্প্রতিক ভাড়া বৃদ্ধি (২০২৪-২০২৫): এই বৃদ্ধি সরাসরি শতকরা হারে না হয়ে 'পন্টেজ চার্জ' আরোপের মাধ্যমে দূরত্বকে কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করে করা হয়েছে। পদ্মা সেতুতে ট্রেন চালুর সময়ও (২০২২-২০২৩) সেতুর প্রতি কিলোমিটারকে ২৫ কিলোমিটার এবং ভায়াডাক্টের প্রতি কিলোমিটারকে পাঁচ কিলোমিটার হিসাবে গণনা করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রেলের ভাড়া না বাড়ায় পরিচালন ব্যয় ও আয়ের মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। ২০১৬ সালের পর এই নতুন পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে 'রেলওয়ে আইন শতভাগ প্রয়োগ' করে লোকসান কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।


 বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ট্রেনের ভাড়া বিশ্লেষণ

বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, যা সাধারণত তিনটি মূল বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

১. মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি খরচ (Inflation and Fuel Costs): অনেক দেশে, যেমন জার্মানি বা যুক্তরাজ্যে, ট্রেনের ভাড়া সাধারণত বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো হয়। জ্বালানি (বিশেষত বিদ্যুৎ) খরচ বাড়লে ভাড়াও বাড়ে।

২. অবকাঠামো বিনিয়োগ (Infrastructure Investment): ফ্রান্স (TGV) বা জাপানে (Shinkansen) নতুন উচ্চ-গতির রেলপথ নির্মাণ বা পুরাতন অবকাঠামো মেরামতের পর সেই খরচ আংশিকভাবে টিকিটের মাধ্যমে পুনরুদ্ধার করা হয়। বাংলাদেশের 'পন্টেজ চার্জ' আরোপের সিদ্ধান্তটি মূলত এই মডেলের কাছাকাছি।

৩. সরকারি ভর্তুকি (Government Subsidy): অনেক উন্নত দেশ, বিশেষ করে ইউরোপে, রেলওয়ে পরিচালনায় প্রচুর সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয় যাতে সাধারণ মানুষের জন্য ভাড়া কম থাকে। সুইজারল্যান্ডে রেল অত্যন্ত উন্নত হলেও ভাড়ার একটি বড় অংশ সরকার বহন করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভর্তুকির এই হার কম থাকায় পরিচালন ব্যয় যাত্রীর ওপর বেশি বর্তায়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প (যেমন পদ্মা সেতু, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ) বাস্তবায়নের পর সেই বিনিয়োগের বোঝা আংশিকভাবে যাত্রীর ওপর চাপানো হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, নিয়মিতভাবে ভাড়া বৃদ্ধি না করে একবারে বড় অবকাঠামো ব্যয়ের কারণে বৃদ্ধি করলে যাত্রীদের অসন্তোষ বাড়ে। এই সময়ে রেলওয়ের উচিত পরিচালন দক্ষতা বাড়িয়ে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আয়ের উৎস বৃদ্ধি করা, কেবল ভাড়া বৃদ্ধির ওপর নির্ভরশীল না হওয়া।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত বাস্তবতার ফল। রেলওয়ে কর্মকর্তারা বলছেন, সেতু স্থাপন ও মেরামতে বাড়তি বিনিয়োগের কারণে রেলওয়ে আইনের অধীনেই ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তবে, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বাড়তি বোঝা। সরকারের উচিত রেলের ভাড়া সহনীয় পর্যায়ে রেখে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত যাত্রীদের জন্য বিশেষ রেয়াত ব্যবস্থা চালু রাখা এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে জনগণের সাশ্রয়ী গণপরিবহন হিসেবে রেলওয়ের গুরুত্ব অক্ষুণ্ন থাকে।




Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *