সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: আগামীর বিশ্ব কি আরও বড় ঝুঁকির মুখে?
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 03 Dec, 2025
ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যেমন গোটা বিশ্বকে এক ক্লিকে সংযুক্ত করেছে, তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে অলসতা, হিংসা ও বিভাজন। এই আসক্তির রেশ কাটতে না কাটতেই মানবতার সামনে নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি অল্প সময়ের মধ্যেই এআই মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হবে। তবে শঙ্কার বিষয় হলো—সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই প্রযুক্তি মানব অস্তিত্বের জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
অ্যালগরিদমের ফাঁদে সৃজনশীলতা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি ব্যবহারের গতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। হার্ভার্ড ও অক্সফোর্ডসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদমগুলো এমনভাবে তৈরি, যা মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করে। এর ফলে হিংসা, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অ্যালগরিদম-চালিত সংস্কৃতি মানুষের সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাড়ছে অলসতা, মনোযোগের ঘাটতি এবং মানসিক চাপ। ‘কপি-পেস্ট’ নির্ভরতা নতুন প্রজন্মকে মৌলিক চিন্তাভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
এআই: সম্ভাবনা নাকি শঙ্কা? প্রযুক্তির নতুন সীমানা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)—নিয়ে বিশ্বজুড়ে উত্তেজনার পাশাপাশি শঙ্কাও প্রবল। চিকিৎসা, শিক্ষা, গবেষণা ও গণমাধ্যমসহ প্রায় সব ক্ষেত্রে এআই ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ইতোমধ্যে এআই ব্যবহার শুরু করেছে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এআই যত দ্রুত এগোচ্ছে, ঝুঁকিও তত বাড়ছে। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির কারণে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এটি ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থা, গণমাধ্যম এবং আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
অস্তিত্বের সংকট ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ‘সুপার-ইন্টেলিজেন্ট এআই’। প্রয়াত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এবং টেক-মোগল ইলন মাস্কসহ অনেক প্রযুক্তিবিদ বহু আগে থেকেই সতর্ক করে আসছেন। তাঁদের মতে, এআই যদি মানুষের চেয়ে অধিক ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং তা মানুষের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে মানবজাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
ভবিষ্যতের ‘হাইব্রিড’ পৃথিবী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে মানুষ ও এআই-এর সম্পর্ক হবে ‘হাইব্রিড’ মডেলের। যেখানে মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেকটাই এআই-এর ডেটা বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করবে। ফলে যাদের প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা থাকবে তারা এগিয়ে যাবে। অন্যদিকে, পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী চাকরি, অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থান—সব ক্ষেত্রেই সংকটে পড়বে। এতে বাড়বে সামাজিক বৈষম্য।
নিয়ন্ত্রণ ও আগামীর পথ বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো ইতোমধ্যে এআই নিয়ন্ত্রণে নড়েচড়ে বসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘EU AI Act’ পাস করেছে; যুক্তরাষ্ট্রও একাধিক নির্বাহী আদেশ জারি করেছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো এখনো নীতিমালা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো এআই-ও সমাজে দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করবে—একদিকে অবারিত সুযোগ, অন্যদিকে ভয়ংকর ঝুঁকি। সঠিক নীতি, নৈতিকতা ও প্রযুক্তি-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার মানবকল্যাণমূলক হবে, নাকি মানবতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে—তা নির্ভর করছে নীতিনির্ধারকদের প্রস্তুতি এবং সমাজের সচেতনতার ওপর।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

