:

ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম

top-news

ভূমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম।অঞ্চলে ভবিষ্যতে যদি ৭/৮ মাত্রার  ভূমিকম্প হয় নগরীর ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে, এবং ঘটতে পারে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের তিনটি প্রধান টেকটনিক প্লেট বার্মিজ-ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার, যেটি ইউরেশিয়ান নামে পরিচিত সেসব প্লেট কাছাকাছি হওয়ায় চট্টগ্রামকে ঘিরে উচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পের ঝঁকি রয়েছে।  ভূমিকম্পের ফলে যে ক্ষয়ক্ষতি হবে তা সারিয়ে তুলতে উদ্ধার কর্মিদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি গণসচেতনা তৈরি, নিয়মিত মহড়া পরিচালনা এবং তদরকি সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর কথা বলছেন তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভারতীয় ও বর্মী এই দুটো টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান হওয়ায় সিলেট-চট্টগ্রামের পাহাড়ি  অঞ্চলে কয়েক’শ বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে শক্তি সঞ্চিত হয়েছে। যার ফলে বড় ধরনের একটি ভূমিকম্প যে কোনো সময়ে বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে। 
গবেষকরা বলছেন,  বাংলাদেশে বড় ধরনের ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটো। একটি উৎস 'ডাউকি ফল্ট' শিলং মালভূমির পাদদেশে ময়মনসিংহ-জামালগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে বিস্তৃত যা প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই ফল্টের পূর্ব প্রান্তে অর্থাৎ সিলেটের জৈন্তাপুর অঞ্চলে ভূমিকম্পের আশংকা খুব বেশি। 

আরেকটি উৎস হচ্ছে সিলেট থেকে ত্রিপুরা হয়ে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, টেকনাফ পর্যন্ত। এই উৎসটি খুব ভয়ংকর বলেও মতামত দেন ভূতাত্বিক বিশেষজ্ঞরা ।

এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, টেকটনিক প্লেটে বাংলাদেশের যে অবস্থান তাতে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল এই পাহাড়ি অঞ্চল যাকে ভূতাত্ত্বিক ভাষায় বলা হয় সাবডাকশন । পশ্চিমের প্লেটটি ভারতীয় প্লেট এবং পূবের পাহাড়ি অঞ্চলটি বার্মা প্লেট। ভারতীয় প্লেটটি বার্মা প্লেটের নিচে অর্থাৎ চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।  

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সাবডাকশন জোনে প্রতিনিয়ত শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। গত কয়েক’শ বছর ধরে সেখানে প্রচুর শক্তি ইতোমধ্যে জমা হয়েছে।
গবেষকরা জানান, প্রতি ১০০ বছরে দেড় মিটার সংকোচন ঘটছে যার ফলে এই অঞ্চলে গত এক হাজার বছরে ১৫ মিটারের মতো সংকোচন হয়েছে অর্থাৎ ১৫ মিটার স্থান চ্যুতি ঘটাতে সক্ষম এরকম শক্তি জমা হয়েছে।

এই সাবডাকশন অঞ্চলের পূর্ব প্রান্তে প্রায়শই ভূমিকম্প হয়।  সেখানে সঞ্চিত শক্তি পাঁচ থেকে ১০ বছর পর পর বের হয়ে যায় এবং  এর মাত্রা থাকে পাঁচ থেকে ছয়। বাংলাদেশের এই অঞ্চলে এর আগেও বড় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। তবে সেগুলো ছিল সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এই দুটো উৎসের বাইরে।

এধরনের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বদলে গেছে, ১৭৯৭ সালে। তখন মেঘনা নদী লালমাই পাহাড়ের  পাদদেশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। বড় ধরনের ভূমিকম্পের ফলে ওই নদীর গতিপথও পরিবর্তিত হয়ে ২০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পশ্চিমে বর্তমান অবস্থানে সরে আসে।

১৭৬২ সালে টেকনাফ থেকে মিয়ানমার  পর্যন্ত ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার উপরে উঠে আসে। সিলেটের মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ এই অঞ্চলে ১৯২২ সালে হয়েছিল ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প। এর আগে ১৮৬৮ সালে ঐ অঞ্চলে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।

ডাউকি ফল্ট যে অঞ্চলে সেই জৈন্তাপুর-সুনামগঞ্জে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৮৯৭ সালে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৮.৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়ে ছিল ১৭৬২ সালে। ভয়াবহ ওই ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের ভূপ্রকৃতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। 

 ভুত্বাত্তিকরা জানান, গেল ৫ বছরে এ অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছে প্রায় ২১২বার। বিশেষ করে বার্মিজ-ইন্ডিয়ান, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়ান এবং ইউরোনেশিয়ান টেকটনিক প্লেটের খুব কাছে হওয়ায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে যেমন ভূমিকম্পের শঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে, তেমনি বিল্ডিং কোড না মেনে ইচ্ছেমতো অপরিকল্পিত বহুতল নির্মাণ, নির্বিচারে পাহাড়কাটা, অপরিকল্পিত নগরায়নসহ মানবসষ্ট নানা হ্যাজার্টের কারনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে বলে জানান আইইবি’ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরী এলাকায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা ভবন রয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি। ২ থেকে ৫ তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে ৯০ হাজার ৪৪৪টি। ৬ থেকে ১০ তলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ১৩ হাজার ১৩৫। ১০ তলার ওপরে ভবন রয়েছে ৫২৭টি। নগরে এখন ২০ তলার বেশি ভবন রয়েছে ১০টি। এই বিপুলসংখ্যক ভবন নির্মাণ করা হলেও এগুলোর অধিকাংশই ইমারত বিধিমালা মানেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বড়ধরণের বিপর্যয় ঘটতে পারে আশংকা নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি আশিক ইমরানের।

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। পাশাপাশি জনগনকে প্রশিক্ষিত করা এবং উদ্ধার কাজে যারা যুক্ত থাকবেন তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলছেন স্থপতি আশিক ইমরান ও প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।

২০০৯ থেকে ২০১১ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিকম্পে ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে জরিপ করেছিল। ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী সেসময়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ভবন ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার। এর মধ্যে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৫০টি ভবন, যা মোট ভবনের ৯২ শতাংশ। এসব  ভবনের মধ্যে  সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।





Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *