:

ভুমিকম্পের মারাত্মক ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম: বড়ধরনের ভূমিকম্প হলে ৭০শতাংশ ভবন ধ্বসে পড়বে

top-news

চট্টগ্রাম একটি উচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল । কারণ এটি বার্মিজ, ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের কাছাকাছি অবস্থিত। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে (যেমন ৭.৫ মাত্রার) নগরের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার মধ্যে স্কুল ও হাসপাতালও রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে । 

চট্টগ্রামে ভূমিকম্পে ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নিয়ে  বিশেষজ্ঞরা  জানিয়েছেন,বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এই অঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ চট্টগ্রাম নগরে থাকা ৩ লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ভূমিকম্প হলে উদ্ধার তৎপরতা চালানো ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যত কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেই বলেও দাবি তাঁদের।

ভূমিকম্পের ঝুঁকি

টেকটোনিক প্লেটের অবস্থান: বার্মিজ, ভারতীয় এবং ইউরেশীয় — এই তিনটি গতিশীল টেকটোনিক প্লেটের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম মারাত্মক ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা: একটি ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পে নগরের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা: চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) তথ্যমতে, নগরের প্রায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ভবনের মধ্যে ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন: স্কুল, হাসপাতাল এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

ঝুঁকির কারণ: দুর্বল নির্মাণ এবং জলাশয় ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

১৯৯৭ সালের ভূমিকম্প: ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ-ভারত-মায়ানমার সীমান্ত অঞ্চলে ৬.১ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল।

১৭৬২ সালের ভূমিকম্প: ১৭৬২ সালে আরাকান উপকূল বরাবর একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল যার তীব্রতা ছিল ৮.৫ থেকে ৮.৮ মাত্রা। এই ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ বদলে যায় এবং যমুনা নদীর জন্ম হয়। 

বিশেষজ্ঞ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের দাবি, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে তদারকি সংস্থা হিসেবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) যে ভূমিকা থাকা উচিত ছিল, তাতে যথেষ্ট গাফিলতি ও ঘাটতি ছিল। সঠিক দায়িত্ব পালন করেনি সংস্থাটি। এই কারণে পরিস্থিতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। লোকবল–সংকটের কারণে ভবন নির্মাণের তদারকিতে ঘাটতি থাকার কথা স্বীকার করেছেন সিডিএর কর্মকর্তারা। তাঁরাও শঙ্কা করছেন, ৭ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রামের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ভবন হয় ধসে পড়বে, না হয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ভূমিকম্পে চট্টগ্রামের ঝুঁকির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে  শুক্রবার২১ নভেম্বর ঢাকায় হওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনার পর। ওই ঘটনায় এ পর্যন্ত ১০জন মারা গেছে। আহতের সংখ্যা ৬০০শ’ ছাড়িয়ে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিকম্পে চট্টগ্রামে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি। তবে ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টা ৫৫ মিনিটে ৬ দশমিক ৯৯ মাত্রার ভূমিকম্পে নগরে ১২টি ভবন হেলে পড়েছিল। এর আগে ১৯৯৭ সালের ২১ নভেম্বর ৬ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম নগরে পাঁচতলা ভবন ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল।

ঝুঁকিতে আড়াই লাখের বেশি ভবন

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১১১টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে একতলা ভবন রয়েছে ২ লাখ ৭৮ হাজার ৫টি। ২ থেকে ৫ তলাবিশিষ্ট ভবন রয়েছে ৯০ হাজার ৪৪৪টি। ৬ থেকে ১০তলা পর্যন্ত ভবনের সংখ্যা ১৩ হাজার ১৩৫। ১০তলার ওপরে ভবন রয়েছে ৫২৭টি। নগরে এখন ২০তলার বেশি ভবন রয়েছে ১০টি। এই বিপুলসংখ্যক ভবন নির্মাণ করা হলেও এগুলোর অধিকাংশই ইমারত বিধিমালা মানেনি।

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম ও সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস  বলেন, শুক্রবার মিয়ানমারে যে মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, তা যদি এখানে হয়, তাহলে ৭০ শতাংশ ভবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁদের হিসেবে, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ভবন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভবন ও স্থাপনাগুলো ভূমিকম্পে কী ধরনের ঝুঁকিতে আছে, তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কোনো জরিপ পরিচালনা করা হয়নি। তবে ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভূমিকম্পে ঝুঁকি মূল্যায়ন নিয়ে জরিপ করেছিল। সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) আওতায় ঢাকা ও সিলেটের পাশাপাশি চট্টগ্রামও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ভবন ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার (মূলত একতলার ঊর্ধ্বে ভবনগুলোকে জরিপের আওতায় আনা হয়েছিল)। এর মধ্যে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রাখা হয় ১ লাখ ৬৮ হাজার ১৫০টি ভবন, যা মোট ভবনের ৯২ শতাংশ। বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়নি। জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

ওই জরিপে চট্টগ্রাম অংশের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, ভূমিকম্পে চট্টগ্রাম ভয়াবহ ঝুঁকিতে আছে। চট্টগ্রাম নগরে যেসব ভবন রয়েছে, তার মধ্যে ৭০ ভাগই ৭ মাত্রার চেয়ে বেশি ভূমিকম্প হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেননা এসব ভবন ইমারত বিধিমালা বা জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে হয়নি। ভবনগুলোতে ভূমিকম্প প্রতিরোধী কোনো ব্যবস্থা নেই। সিডিএও কোনো ধরনের তদারকি করেনি। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এগুলোর বেশির ভাগ পুরোপুরি ধসে পড়বে, কিছু আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে প্রচুর মানুষ হতাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এখন জরুরি ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে তার শক্তি বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।

এ ধরনের বিপর্যয় পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এখানে কোনো ধরনের প্রস্তুতি নেই বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বলেন, এককথায় ভূমিকম্প–পরবর্তী অবস্থা মোকাবিলা করতে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত। ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, সিডিএ—কারও কোনো ভূমিকম্প নিয়ে বিশেষ কোনো প্রস্তুতি নেই। উদ্ধার তৎপরতার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই। আবার অনেক ভবন নির্মিত হয়েছে ঘিঞ্জি এলাকায়। কোথাও কোথাও গলিগুলো এমন সরু সেখানে উদ্ধারকারী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার সুযোগ পর্যন্ত নেই। 

চট্টগ্রাম মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের সময় ৮টি স্তরে অনুমোদন নিতে হয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের। এগুলো হলো ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, নির্মাণকাজ শুরু অবহিতকরণ ও কারিগরি ব্যক্তিদের সম্মতিপত্র, ভবনের প্লিন্থস্তুর (ভিত্তি স্তম্ভ) পর্যন্ত কাজ সম্পর্কে কারিগরি ব্যক্তিদের প্রতিবেদন, ভবনের নির্মাণকাজ সমাপ্তি অবহিতকরণপত্র, কারিগরি ব্যক্তিদের প্রত্যয়নপত্র, ব্যবহার সনদ ও পাঁচ বছর পর ব্যবহার সনদ নবায়ন। কিন্তু চট্টগ্রামে গড়ে ওঠা অধিকাংশ ভবনের নকশা অনুমোদন নিলেও অনুমোদনের পরের ধাপগুলো অনুমোদন নিতে তোয়াক্কা করেন না মালিকেরা।

সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। তবে এখন নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।  বলেন, ১ থেকে ১০তলা ভবনগুলো নিজেরা যাচাই করছেন। ১০তলার ওপরের ভবনগুলো বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক দিয়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *